বেলালের ‘মানবতার স্কুল’

ক্লাস শুরুর আগে শিশু শিক্ষার্থীদের সমাবেশ
বেলাল আহমেদ রংপুরের একজন প্রতিষ্ঠিত ওষুধ ব্যবসায়ী। তবে দরিদ্র পরিবারের স্কুলবিমুখ শিশুদের নিয়ে ভাবনা তার অনেক আগে থেকেই। কলেজজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে খোলা মাঠে অবহেলিত শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। বস্তি এলাকার শিশুদের আগ্রহ থাকায় ২০১৪ সালে তিনি নগরীর দেওডোবা এলাকায় বেগম রোকেয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতন নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
যেখানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় বিনা খরচে। এমনকি স্কুলের পোশাক, জুতা, ব্যাগ, বই-খাতাসহ সব শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয় স্কুল থেকেই। অভাবী সংসারের যেসব শিশুকে একসময় বাবার সঙ্গে চায়ের দোকানে কিংবা ক্ষেতে কাজ করতে হতো, তারা এখন স্কুলের পোশাক পরে, ব্যাগ হাতে নিয়মিত স্কুলে যায় আর ১০ জন শিশুর মতো। কোনো রকম খরচ ছাড়াই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পারায় লেখাপড়ায় তাদের আগ্রহ বাড়ছে। এজন্য এলাকায় এটি ‘মানবতার স্কুল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
রংপুরের মিঠাপুকুরের মৃত ইলিয়াস আহমেদের ছেলে বেলাল আহমেদ। বর্তমানে রংপুর নগরের কলেজ রোডের খামার মোড় এলাকায় থাকেন। দেওডোবা এলাকায় খাসজমিতে গড়ে ওঠা বস্তিকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় জমি ইজারা নিয়ে গড়ে তোলেন স্কুলটি। প্রথমে শিশু শ্রেণির ২৫ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে তা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হয়।
বেলাল আহমেদ (৪৫) নিজেই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। সাতজন শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত জাতীয় সংগীত, সমাবেশ ও শপথবাক্য পাঠ করানো হয়। মাঝেমধ্যে টিফিনের সময় স্কুলে রান্না করে শিক্ষার্থীদের খাওয়ানোর পাশাপাশি প্রতি বছর পিকনিক, আনন্দভ্রমণ, ফল উৎসবসহ বিভিন্ন দিবসে তাদের নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১৫ জন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রহিমা আক্তার রিম ও পঞ্চম শ্রেণির জুবাইদা আক্তার জীম বলে, ‘এই স্কুলে আমরা শিশু শ্রেণি থেকে পড়ছি। বই-খাতা, ব্যাগ, ড্রেস, জুতা— সবকিছু পাই এখানে। এক টাকাও খরচ দিতে হয় না।’
এই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে রুমা আক্তার। বর্তমানে সে রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রুমার ভাষ্য, ‘বেলাল স্যারের বেগম রোকেয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে শুরুটা হয়েছিল বলেই আজকে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি। তা না হলে লেখাপড়ার স্বপ্ন কখনোই পূরণ করতে পারতাম না।’
স্কুলের শিক্ষক সুমি আক্তারের অভিব্যক্তি, ‘কয়েক বছর ধরে এখানে শিশু শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছি, খুব ভালো লাগে। বেতন কত পাই, তা বড় কথা নয়; বাড়ির পাশে হওয়ায় সংসার সামলে স্কুল করতে পারি। বেলাল স্যারের মহতী উদ্যোগে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা একদিন ভালো কোনো জায়গায় সুযোগ পাবে। তখন তাদের কাছে আজকের এই স্কুলটি ইতিহাস হয়ে থাকবে, সার্থকতা সেটিই।’
অভিভাবক চায়ের দোকানদার যাদু মিয়া বললেন, ‘আমার ছেলে আগে আমার সঙ্গে চায়ের দোকানে বসত। বর্তমানে এখানে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।’
রংপুর সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মিঠু মিয়া বললেন, বেলাল আহমেদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা বেগম রোকেয়া আদর্শ শিক্ষা নিকেতনটি আসলেই ‘মানবতার স্কুল’। স্থানীয় বস্তিসহ আশপাশ এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুরা এখানে কোনো টাকা ছাড়াই লেখাপড়া করছে, এতে অনেকের আগ্রহ বাড়ছে।
উদ্যোক্তা বেলাল আহমেদ নিজের টাকায় স্কুলটি পরিচালনা করছেন। তিনি বললেন, ‘ছাত্রজীবনে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের নিয়ে ভাবনা থেকেই আজকের এই প্রয়াস। শুধু পড়াশোনাই নয়, এখানকার শিক্ষার্থীদের কর্মউদ্যোগী করে গড়ে তোলাই আমার মূল লক্ষ্য।’



