তোফাজ্জলকে ভাত খাইয়ে পিটিয়ে হত্যার দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার
- ঢাবির হলে তোফাজ্জল হত্যার দুই বছর
- ২৮ আসামির ১৭ জনই পলাতক

ফাইল ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলাটি এখনো বিচার শুরুর পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অভিযুক্ত ২৮ আসামির মধ্যে ১৭ জনকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি হলেও তারা এখনো অধরা। বিচার না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নিহতের পরিবার।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাবির ফজলুল হক মুসলিম হলে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে ‘চোর সন্দেহে’ পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
নিহত তোফাজ্জলের ফুফাতো বোন আসমা আক্তার বললেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল, এখনো বিচার শুরু হয়নি। এভাবে চললে কীভাবে বিচার শেষ হবে। আমরা দ্রুত সময়ে ন্যায়বিচার চাই।’
আদালত ও মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শাহবাগ থানায় মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
এ মামলার আসামিরা হলেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক উপবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া, ওই হলের আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ, ভূগোল বিভাগের আল হোসাইন সাজ্জাদ, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মিয়া, ওয়াজিবুল আলম, ফিরোজ কবির, আব্দুস সামাদ, সাকিব রায়হান, ইয়াছিন আলী, ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম, ফজলে রাব্বি, শাহরিয়ার কবির শোভন, মেহেদী হাসান ইমরান, রাতুল হাসান, সুলতান মিয়া, নাসির উদ্দিন, মোবাশ্বের বিল্লাহ, শিশির আহমেদ, মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি, আব্দুল্লাহিল কাফী, শেখ রমজান আলী রকি, রাশেদ কামাল অনিক, মনিরুজ্জামান সোহাগ, আবু রায়হান, রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ, রাব্বিকুল রিয়াদ এবং আশরাফ আলী মুন্সী। তাদের মধ্যে রেদোয়ানুর রহমান, রাশেদ কামাল, আবু রায়হান, মনিরুজ্জামান, আহসান উল্লাহ, সাজ্জাদ, মোত্তাকিন সাকিন, ওয়াজিবুল ও রমজান আলী জামিনে এবং আসামি জালাল মিয়া ও সুমন মিয়া কারাগারে রয়েছেন। তবে অন্য ১৭ আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান। অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে নারাজি দাখিল করা হয়। এরপর গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুজ্জামান পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর নতুন করে আরও সাতজনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
সম্পূরক অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন ভুক্তভোগী তোফাজ্জল হলের মূল গেট দিয়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে প্রবেশ করেন। এর ৩ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর হলের মাঠে ঢোকেন। খেলা পরিচালনা মঞ্চের পাশ দিয়ে খেলার মাঠে বসার ৫৭ সেকেন্ড পরই ছাত্ররা চোর সন্দেহে তাকে মারতে থাকেন। সেখান থেকে উত্তেজিত ছাত্ররা তাকে মূল ভবনের দিকে নিয়ে যান। ২৫ মিনিট জেরা ও মারধরের পর একদল ছাত্র বুঝতে পারেন মোবাইল ফোন চোরের সঙ্গে এ আসামির সম্পর্ক নেই। পরে তাকে হলের ক্যান্টিনে খাওয়ানো হয়। খাওয়ানো শেষে আবার ভুক্তভোগীকে মারা হয়। শিক্ষকরা এসে ছাত্রদের বুঝিয়ে ভুক্তভোগীকে নেওয়ার চেষ্টা করে প্রথমে ব্যর্থ হন। পরে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তোফাজ্জলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক শাহ আলম জানিয়েছেন, ১৭ আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রয়েছে। প্রতিবেদন এলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মামলার বাদী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বললেন, ‘প্রতি হাজিরার দিন আদালতে গিয়ে মামলার খোঁজ নেওয়া হয়। আমরা চাই, দ্রুত সময়ে প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।’
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘মামলাটি জজকোর্টে বদলি আসলে আমরা অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু করব। পরে দ্রুত সাক্ষীদের হাজির করে মামলাটি নিষ্পত্তি করা হবে। ভুক্তভোগীর পরিবার যাতে ন্যায় বিচার পায়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’



