প্রসঙ্গ সৌরবিদ্যুৎ
লোডশেডিং কমাতে বাধা লোডশেডিংই!
- ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০% আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে
- ছাদ থেকে সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করলে ইউনিটপ্রতি সাড়ে ১০ টাকায় কিনবে সরকার
- দ্রুত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করতে হবে দক্ষ জনবল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লোডশেডিং কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের প্রণোদনার পাশাপাশি যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। মুশকিল হলো, অনগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রয়োজন পড়ে বিদ্যুতের। যদি ঘন ঘন লোডশেডিংই হয়, তাহলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনও হবে ব্যাহত। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাধা খোদ লোডশেডিং। সংশ্লিষ্টরাও ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন। যার অন্যতম এই লোডশেডিং।
জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। যার বড় অংশই আসবে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। এর মধ্যে ছাদে বসানো প্যানেল থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট এবং মাটিতে বসানো প্যানেল থেকে সাড়ে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে নির্ধারিত ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় ২০২৫ সালে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও প্রকৃত অর্জন এখনো ৫ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে।
তবে এবারের সংকটের কারণে বদলেছে পরিস্থিতি। এরই মধ্যে বেশ কিছু বড় কারখানা তাদের বিদ্যুতের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ ছাদের সৌর প্যানেল থেকেই পূরণ করছে। কারণ, গ্রিড বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে শিল্প খাতে খরচ পড়ছে ১২ টাকার বেশি, সেখানে ঋণ নিয়ে নিজস্ব ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছে ৬ থেকে ৮ টাকা। আবার ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগ ছাড়াই গ্রিডের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ থাকায় একের পর এক কারখানা এই পথে ঝুঁকছে। উৎসাহ আরও বাড়াতে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ছাদে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে কেনা হবে। এ সুবিধা পেতে হলে গ্রাহকদের ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে হবে আর প্রণোদনা মিলবে তিন বছর মেয়াদে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতিতে বিতরণ সংস্থাগুলো হিসাব রেখে প্রতি তিন মাসে অর্থ পরিশোধ করবে। এ ছাড়া সৌরযন্ত্রাংশ আমদানিতে ছয় মাসের জন্য শুল্ক ছাড় দিয়ে পরিপত্রও জারি হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান নিও বিভির করা এক সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকার ছাদ ব্যবহার করেই ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এসব ভবনের অর্ধেক সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলেও মিলতে পারে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ। শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার হাজার কারখানার ছাদ থেকেই সম্ভব চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন। এ ছাড়া দেশের দুই শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদও কাজে লাগানো গেলে সেগুলো নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদা নিজেরাই মেটাতে পারবে। তবে এ বিপুল সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে অন্তত তিনটি বড় বাধা চিহ্নিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
যার মধ্যে অন্যতম, লোডশেডিং; যা গ্রীষ্মে গ্রামাঞ্চলে বেশিরভাগ সময়ই ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অনগ্রিড সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হয়। এটি গ্রিড বিদ্যুতের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করার কারণে বিদ্যুৎ না থাকলে এর ইনভার্টার বন্ধ হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এতে নিজস্ব বিনিয়োগে স্থাপিত অনগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি ওপেক্স মডেলের বিনিয়োগকারীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। আবার ব্যাটারি যুক্ত করে এ সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব হলেও তাতে খরচ বেড়ে যায়।
আরেক সমস্যা বিনিয়োগ ও তার নিরাপত্তা নিয়ে। বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মো. মোস্তফা আল মাহমুদের মতে, সরকার সৌরবান্ধব যেসব নীতি নিচ্ছে, তা প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগকারীরা যাতে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পান, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। এ ছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের জন্য অন্যান্য দেশের মতো নগদ প্রণোদনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি। মানসম্মত যন্ত্রাংশ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও এ খাতের বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেছেন, মানুষের আগ্রহ যেহেতু বাড়ছে, তাই দ্রুত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা দরকার। তার মতে, সরকারের ঘোষিত ছয় মাসের করছাড়ের মেয়াদ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারত, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা এখানে শিক্ষণীয় হতে পারে। ২০০৬ সালে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের পর ভারতের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ২০১৪ সালের ২ দশমিক ৮২ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ৬৬ গিগাওয়াটে আর প্রণোদনা ও সহজ ঋণসুবিধার সুবাদে ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ তা পৌঁছায় ১৫০ দশমিক ২৬ গিগাওয়াটে। ভিয়েতনামে ২০১৮ সালে মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে সক্ষমতা ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়, যার ৯ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি এসেছে ছাদ থেকে। অন্যদিকে পাকিস্তানে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও করছাড়ের কারণে গ্রিড-সংযুক্ত ছাদবিদ্যুৎ ছয় হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে গ্রিডের চাহিদা কমে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে নতুন এক ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের খরচ কমাতে প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অবকাঠামো আমদানিতে করসুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য ছয় মাসের বিশেষ ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে।
বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে জমির খরচ কমাতে সরকারি অব্যবহৃত জমি ব্যবহারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৬০ হাজার একর জমির তথ্য সংগ্রহের পর যাচাই-বাছাই করে প্রায় ৩০ হাজার একর জমি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকার এসব জমি বরাদ্দ দেবে আর বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থ ও প্রযুক্তি নিয়ে আসবেন। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।



