ডিজেলসহ সব জ্বালানি তেলে লিটারে বাড়ল ২০ টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ববাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। আজ রবিবার রাতে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা করা হয়েছে।
দাম বাড়ানোর ঘোষণার পর জ্বালানি বিভাগ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এখনো অব্যাহত আছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার জনস্বার্থে দেশে দাম বাড়ায়নি। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
সরকার গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও বিগত ৫ মাস দেশে তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে জ্বালানি তেলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে ডিজেলের মূল্য ভারতে (কলকাতা) ১৩৪.৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১.২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯.৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭.০০ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০.৭১ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮.৫৩ টাকা, পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪.৭৯ টাকা। এর ফলে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বনিম্ন হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। সে হিসেবে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু ডিজেলে বছরে প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করা হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিপিসির ব্যাংক হিসাবে এখন প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা রয়েছে। এ অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় মেটানো গেলেও অক্টোবরে তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে অর্থসংকট তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিপিসিকে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত নেওয়া হয়নি বলেও জানানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় বিপিসির আমদানি ব্যয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠেছিল। বৃহস্পতিবার তা কমে প্রায় ১০২ ডলারে নেমেছে।
বিপিসির হিসাবে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের এপ্রিলে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এপ্রিলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯৪ শতাংশ। মে মাসে ২০২৫ সালের ৪ হাজার ১৮২ কোটি টাকার বিপরীতে চলতি বছর ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, যা প্রায় ২২২ শতাংশ বেশি। আগস্টে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যেখানে গত বছর একই মাসে ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। বৃদ্ধি প্রায় ১৭৭ শতাংশ।
এই বাড়তি ব্যয়ের বড় চাপ পড়েছে ডিজেলে। বিপিসির হিসাবে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় প্রতি লিটার ডিজেলে ৯০ টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। এতে দৈনিক লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫ কোটি টাকা। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিলেই লোকসান ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি এবং জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।
আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি শুল্কও বিপিসির খরচ বাড়াচ্ছে। আগে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নেওয়া হলেও এখন ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ে শুল্কও বাড়ছে। প্রতি লিটার তেলে শুল্ক ফেব্রুয়ারিতে ১৮ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে মার্চে ৩৮ টাকা ৬৪ পয়সা, এপ্রিলে ৩৮ টাকা ৯০ পয়সা এবং আগস্টে ৩২ টাকা ৪৪ পয়সায় ওঠে। ফলে শুল্কসহ প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির ব্যয় এখন প্রায় ২০৫ টাকা।
তেল আমদানির অর্থ জোগাতে চলতি বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলেছে বিপিসি। অথচ নিয়ম অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্তত দুই মাসের তেল আমদানির অর্থ সংস্থাটির হিসাবে থাকার কথা। সে হিসাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা হলেও বর্তমানে রয়েছে ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা।
এর সঙ্গে সামনে রয়েছে আরও কয়েকটি বড় ব্যয়। ডিসেম্বরের মধ্যে এলপিজি প্ল্যান্টের জন্য জমি অধিগ্রহণে ৫২৪ কোটি টাকা, এসপিএম প্রকল্পের ঋণের কিস্তিতে ৬৯০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য প্রকল্পে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
বছরের শুরু থেকে তেলের দাম
চলতি বছরের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম দুই দফায় কমেছিল। ফেব্রুয়ারিতে ডিজেল ১০০, কেরোসিন ১১২, পেট্রল ১১৬ ও অকটেন ১২০ টাকা হয়। মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল।
এপ্রিলে বড় ধরনের সমন্বয়ে ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বা ১৫ শতাংশ, কেরোসিন ১৮ টাকা বা ১৬ দশমিক ০৭ শতাংশ, পেট্রল ১৯ টাকা বা ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং অকটেন ২০ টাকা বা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বাড়ে।
জুনে কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনে আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এ বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৫, ৩ দশমিক ৭০ ও ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এরপর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম অপরিবর্তিত ছিল।
বর্তমানে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা লিটার। জানুয়ারির তুলনায় এখন ডিজেলের দাম ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, কেরোসিন ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ, পেট্রল ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং অকটেন ১৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি।



