ঢাকার বাস
নারীর সংরক্ষিত আসনও অরক্ষিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অফিসে আসা-যাওয়ার পথে প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করেন বেসরকারি চাকরিজীবী আফসানা। তবে অধিকাংশ সময়ই দেখতে পান ফাঁকা নেই সংরক্ষিত নারী আসন। অথচ বাসের সাধারণ আসনগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে এবং তাকে সেখানেই গিয়ে বসতে হয়। আবার কখনো আসন খালি না থাকলে পুরো পথ দাঁড়িয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। কোনো সহৃদয় যাত্রী সাধারণ আসন ছেড়ে দিলে একটু বসার সুযোগ মেলে। আফসানার জন্য এটি প্রতিদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা।
শুধু আফসানা নন, এটি আসলে রাজধানী ঢাকায় বাসে যাতায়াতকারী নারীদের নিত্যদিনের চিত্র। যাদের জন্য আসন সংরক্ষিত, সেখানে প্রায়শই তাদের দেখা মেলে না; বরং সেই আসনে জেঁকে বসে থাকেন পুরুষ যাত্রীরা। তবে গণপরিবহনে এই ভোগান্তি শুধু নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা ভরা বাসে উঠলেও তাদের নির্ধারিত আসন পাওয়ার দৃশ্য বিরল।
অথচ গণপরিবহনে আসন সংরক্ষিত রাখার স্পষ্ট সরকারি নির্দেশনা আছে। ‘বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ অনুযায়ী, পাবলিক বাসে নারী, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক। সেই অনুযায়ী বাসের সামনের সারিতে ‘সংরক্ষিত আসন’ কথাটি লেখা থাকে। সাধারণত একটি ২৭ আসনের বাসে ৬টি এবং ৪৪ আসনের বাসে ৯টি আসন সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু আইন থাকলেও সমস্যা দেখা দেয় এর বাস্তবায়নে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর অনেক বাসেই নেই ‘সংরক্ষিত’ আসনের নোটিস। কিছু বাসে থাকলেও তা এমন অবস্থায় থাকে যে ভালোভাবে বোঝাই যায় না।
মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন আয়েশা। সদরঘাট থেকে সচিবালয় পর্যন্ত বাসে এসে সেখান থেকে তিনি মেট্রো ধরেন। তবে সচিবালয় পর্যন্ত স্বল্প পথেই তার ভোগান্তির শেষ থাকে না। আগামীর সময়কে বললেন, ‘অনেক সময় বাসে উঠে দেখি নারীদের আসনে পুরুষ যাত্রীরা বসে আছেন, অথচ পেছনের আসন ফাঁকা। তাদের আসন ছাড়তে বললে শুনতেই চান না। উল্টো বলেন— অন্য সিট তো ফাঁকা আছে, সেখানে বসলে সমস্যা কী?’
আয়েশার ভাষ্য, ‘গুলিস্তান থেকে প্রচুর যাত্রী ওঠেন। বাসের মাঝামাঝি বা পেছনের আসনে বসলে গন্তব্যে নামার সময় ভিড় ঠেলে নামতে ভীষণ কষ্ট হয়। কিন্তু দরজার পাশেই নারীদের সিট থাকায় সেখান থেকে সহজে নামা যায়। এজন্যই সংরক্ষিত আসনটি নারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।’
আইন অমান্যের বিষয়ে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতা একেবারেই কম। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী— বাসে নারী, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী বসলে ১ মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান। কিন্তু এই আইনের দৃশ্যমান ও কঠোর প্রয়োগ না থাকায় পুরুষ যাত্রীরা বিষয়টিকে একেবারেই গুরুত্ব দেন না।
এ বিষয়ে একাধিক বাসচালকের দাবি, তারা পুরুষ যাত্রীদের বসতে নিষেধ করলে তারা বলেন যে নারী যাত্রী উঠলে আসন ছেড়ে দেবেন। কিন্তু পরে আর ছাড়তে চান না। যাত্রীরা কথা না শুনলে চালক বা সহকারীদের কিছু করার থাকে না বলেও দাবি তাদের।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৭ হাজারের বেশি বাস ও মিনিবাস চলাচলের অনুমোদন থাকলেও প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। এ হিসেবে প্রতিদিন ২০ লাখেরও বেশি মানুষ যাতায়াত করে। প্রকৃত অর্থে চলাচলকারী মানুষের সংখ্যা আরো বেশি। যার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কর্মজীবী নারী, স্কুল-কলেজের ছাত্রী ও সাধারণ নারী যাত্রীরা।
কর্মজীবী নারীরা জানান, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয় রাতে। অফিস থেকে ফেরার সময়। একই সময়ে অনেকের অফিস শেষ হওয়ায় বাসে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ থাকে। এ সময় গাদাগাদি করে পুরুষ যাত্রীরা বাসে উঠলেও চালকেরা নারীদের তুলতে চান না। ফলে সংরক্ষিত আসন থাকা সত্ত্বেও নারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফাঁকা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। খুঁজতে হয় বিকল্প উপায়।
বিষয়টি স্বীকার করে ভিক্টর ক্লাসিক বাসের চালক সাইফুল হক জানাচ্ছিলেন, ‘রাতে অফিসের কাজ শেষ হলে বাসে চাপ থাকে। অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে যান। ওই ভিড়ে মেয়েদের কীভাবে তুলব? তাদের বাসে নিলে তাদের নিজেদেরই সমস্যা হয়, আবার অন্যদের নামতেও ঝামেলা হয়। ছেলেরা তো ঝুলেও যেতে পারে।’
এদিকে একে তো সংরক্ষিত আসন সংখ্যায় কয়েকটি, তার ওপর বাস্তবে তাও কার্যকর নয়। ফলে বাসে যাতায়াতকারী নারীরা বলছেন— রাজধানীর গণপরিবহনগুলো কোনোভাবেই নারীবান্ধব নয়। বাংলাদেশ রোড সেফটি নেটওয়ার্কের এক জরিপের তথ্য, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতকারী নারীদের ৮৩ শতাংশই প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের বাসগুলো একদমই নারীবান্ধব নয়। বাসে সংরক্ষিত আসন থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় না। আমরা সমাজকে এখনো নারীর প্রতি সংবেদনশীল করে গড়ে তুলতে পারিনি। নারীদের বিশেষ অধিকার বা সুবিধার কথা বললে অনেকেই তর্ক তোলেন, নারী-পুরুষ তো সমান, আলাদা সুযোগের প্রয়োজন কী? কিন্তু বাস্তবে কি তাই? গত মাসেও ৫৮ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছে। নারীদের সেই উপযুক্ত সামাজিক অবস্থানে না এনেই আমরা সমতার কথা বলছি, যা সমতার মূল নীতিরই পরিপন্থী।’
তবে আইন প্রয়োগ ও মনিটরিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ-এর এনফোর্সমেন্ট শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাজিদ আনোয়ার জানাচ্ছিলেন, তারা নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
‘আসন পাওয়ার অধিকারী নারী বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন অথচ অন্য কেউ বসে আছে— এমনটা আমাদের নজরে সচরাচর আসেনি। আমরা অনেক সময় আসন ফাঁকাও পাই। তবে আমরা প্রতিনিয়তই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি এবং আইন অমান্যকারীদের জরিমানা করছি। কোনো বাসে অভিযান চালানোর সময় চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, ধূমপান করছেন কিনা এবং সংরক্ষিত আসনের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা; এমন বিষয়গুলো নজরদারিতে আনা হয়।’






