যে শরীরে লেখা জুলাইয়ের গল্প
- আজও আহতদের জীবনে থামেনি যুদ্ধ
- পরিবারের আশার প্রদীপই নিজেকে ভাবেন বোঝা
- সহযোগিতা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার নিশ্চয়তা

বিছানার পাশে ঠেস দিয়ে রাখা ক্রাচ। বালিশের পাশে ওষুধের স্তূপ। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এখনো পড়ে আছে প্রকৌশলবিদ্যার বই। সেগুলো যেন নীরব সাক্ষী হয়ে আছে তার থমকে যাওয়া জীবনের। যে পা নিয়ে ক্যাম্পাসের করিডর পেরিয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নে ছুটে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই পা এখন যন্ত্রণার আধার। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ১৯ বছরের রনি এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখেন বন্ধুদের পথচলা। আর তিনি আটকে আছেন ২০২৪ সালের ১৭ জুলাইয়ের একটি দুপুরে। বরিশালের নথুল্লাবাদে পুলিশের ছোড়া গুলির স্প্লিন্টারে যেদিন ছিঁড়েছিল তার ডান পায়ের লিগামেন্ট। যার জেরে তার জীবন এখন পঙ্গুত্বের।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অনেকের মতো রাজপথে সরব ছিল ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র রবিন। সেদিন ছিল ১৯ জুলাই, শুক্রবার। রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ডের ঢালে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচিতে ছিল রবিনও। বিকালের দিকে হঠাৎ পুলিশ ও দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। গুলিবিদ্ধ হয়ে অচেতন অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে রবিন। মৃত ভেবে নিথর দেহটি সরাতে যান সঙ্গীরা। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পান, সে জীবিত। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে প্রাণে বেঁচে যায় রনি, কিন্তু বাঁচানো যায়নি তার ডান চোখটি। যে চোখে ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই চোখে এখন অন্ধকার।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পার হয়েছে দুই বছর। কিন্তু সেই আন্দোলনে রাজপথে থেকে আহত হওয়া অনেকের জীবনে থামেনি যুদ্ধ। গুলির শব্দ থেমেছে, রাস্তায় মানুষের ঢল নেই, স্লোগান নেই। অথচ তাদের প্রতিদিনের জীবন এখনো যেন সেই জুলাইয়েই পড়ে আছে। কেউ নতুন করে হাঁটতে শিখছেন। কেউবা পড়াশোনা শুরুর চেষ্টা করছেন। কেউ কাজের সন্ধান করছেন। আর কেউ অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে খুঁজছেন ভবিষ্যৎ।
সবশেষ সরকারি হিসাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৪৩ এবং আহতের সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০ জন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যনুযায়ী, এ পর্যন্ত গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে দেশে ফেরত এসেছেন ১০৫ এবং ৩৯ জন এখনো বিদেশে। এ ছাড়া গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন অন্তত ৫৩৭ জন।
প্রশ্ন জাগে, কেমন আছেন যারা জুলাই আন্দোলনে আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করে বেঁচে আছেন?
বরগুনা পাথরঘাটার দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান রনি গণঅভ্যুত্থানের সময় বরিশাল সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল বিভাগের পঞ্চম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৭ জুলাই নথুল্লাবাদে প্রায় ১০ জন পুলিশ তাকে ঘিরে নির্যাতন চালায়। আত্মরক্ষায় দৌড়ে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে মাটিতে লুটে পড়েন তিনি। এরপরের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বললেন, প্রায় ১ বছর ৮ মাস থাকতে হয়েছে হাসপাতালের বিছানায়। ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় অসাড় হয়ে পড়েছে পা। স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে পারেন না। চোেখও সমস্যা। কিন্তু প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন এখনো তার চোখে। তবে সেই স্বপ্নের পথে এখন বাধা একটি অসাড় পা, একটি ক্ষতিগ্রস্ত চোখ আর দীর্ঘ চিকিৎসার বাস্তবতা।
রনির অভিযোগ, ‘যে বৈষম্য দূর করতে জুলাই আন্দোলনে পঙ্গুত্বকে বরণ করলেন, আজ তার সঙ্গে সে বৈষম্যই হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও পুনর্বাসন আইন ২০২৫ অনুযায়ী একজন জুলাই আহত চিরজীবনের জন্য কর্মক্ষম হলে এবং পঙ্গুত্ববরণ করলে তিনি এ-ক্যাটাগরি প্রাপ্য হবেন। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়েছে বি-ক্যাটাগরি। এখন ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’
আহতদের একজন বরিশাল সদরের বাসিন্দা মোহাম্মদ তামিম। বর্তমানে বরিশালের দুর্গাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পুলিশের গুলিতে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছে। আন্দোলনের সময় ছিল মামার বিয়ে। সেজন্যই গ্রামের বাড়ি থেকে তখন ঢাকায় এসেছিল। ৫ আগস্ট মিরপুর-২ নম্বরে বিজয় মিছিলে অংশ নেয় তামিম। তখন পুলিশের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার ডান পা, যা পরে কেটে ফেলতে হয়। এখন কৃত্রিম পা আর ক্রাচই তার চলার পথের ভরসা।
নিজের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে তামিম বলছিল, ‘জুলাইয়ের আগে পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতাম। আর এখন ঘরেই বন্দিজীবন। যেখানে ফ্যামিলির আশা-ভরসা কারণ হতাম, সেখানে এখন নিজেই তাদের কাছে বড় বোঝা হয়ে গেছি।’
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কারওয়ান বাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান সাব্বির আহমাদ। তিনি জানালেন, ঢাকা মেডিকেলে মরদেহের সঙ্গে ফেলে রাখা হয়েছিল তাকে। সেখান থেকে ফিরে এসেছেন। নিজের জীবনের বেদনার কথা তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘আড়াই মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে কখনো চোখে দেখিনি। স্পর্শ করেই তাকে অনুভব করতে হয় এখন।’
জুলাই ভাতা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হলেও হাত পাততে চান না সাব্বির। চান শুধু যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি।
মিরপুর-১০ নম্বরে ৪ আগস্ট পুলিশের গাড়িচাপায় ডান পা ক্ষতিগ্রস্ত হয় আব্দুল্লাহ আহমাদের। সেদিনের কথা মনে হলে এখনো বুকটা ভার হয়ে আসে তার। ডান পায়ের তিনটি লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। শরীরের ভার পা নিতে পারে না আগের মতো। তবু স্বপ্ন থামিয়ে রাখেননি তিনি। ২০২৫ সালে এইচএসসি শেষ করে এখন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পায়ে করতে হবে আরও তিন থেকে চারটি অস্ত্রোপচার।
যে স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলন তা কি পূরণ হয়েছে— এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আব্দুল্লাহর কণ্ঠে ছিল সংযম। কোনো সরকার বা রাজনৈতিক পক্ষ নিয়ে মন্তব্য করতে চান না তিনি। তবে দেশের বাস্তবতা নিয়ে হতাশ আব্দুল্লাহ বললেন, ‘দুর্নীতি, অন্যায় ও নানা অনিয়ম এখনো থেমে যায়নি। যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে আমরা পথে নেমেছিলাম, এর পুরোপুরি প্রতিফলন এখনো দেখছি না।’










