সাক্ষাৎকার
ছাত্রদল পরিচয়ই ছিল বড় বাধা
- প্রথমে আন্দোলনের সঙ্গে মিশে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করি
- রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির কিছু অংশ এখনো টিকে আছে

আবিদুল ইসলাম খান
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনালগ্ন থেকে আন্দোলনের কৌশল, চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আগামীর সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিটন ইসলাম।
প্রশ্ন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কীভাবে সম্পৃক্ত হলেন?
আবিদুল ইসলাম খান: আমি এই আন্দোলনের সূচনা দেখি জুন মাস থেকেই, যখন কোটাসংক্রান্ত পরিপত্র পুনর্বহাল হয়। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ আমাকে বিষয়টি বিশ্লেষণে সহায়তা করে। তখনই বুঝতে পারি, এটি বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
৭ জুন জুনিয়রদের নিয়ে আলোচনা করি— প্রথমে আন্দোলনের সঙ্গে মিশে আস্থা অর্জন করতে হবে, তারপর ধীরে ধীরে প্রভাব তৈরি করতে হবে। আমরা সাতজনের একটি ছোট গ্রুপে পরিকল্পনা করি এবং নিয়মিত সমন্বয় চালাই।
ঈদের সময় অনেক শিক্ষার্থী না থাকায় সাত কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০-৬০ জনকে নিয়ে একটি দল গড়ে ওঠে। মিলন চত্বর ও রাজু ভাস্কর্যে আমরা সক্রিয় ছিলাম। ১ জুলাইয়ের আলটিমেটাম পর্যন্ত আমরা ভেতর থেকেই কাজ করেছি। শেষ পর্যন্ত আমাদের কৌশল— ধীরে ধীরে প্রভাব তৈরি এবং পরে সেটা কার্যকর হয়।
প্রশ্ন: আন্দোলনের সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
আবিদুল ইসলাম: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ছাত্রদল পরিচয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেখানে সহজে অংশ নিতে পেরেছে, সেখানে আমাদের সীমাবদ্ধতা ও চাপ ছিল অনেক বেশি। আমাদের ‘ছাত্রদলের ছেলে’ পরিচয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সরিয়ে দেওয়া হতো।
৫ জুলাইয়ের দিকে পরোক্ষভাবে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমরা মূলত স্লোগান, কবিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই যুক্ত ছিলাম। এ ছাড়া মূল ধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ছিল না। এ অবস্থায় আমরা বিকল্প পথ নিই— শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপস্থিত থাকা, তাদের আবেগ ও ক্ষোভ সংগঠিত করা। লক্ষ্য ছিল আন্দোলনকে ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক রূপ দেওয়া। ভেতর থেকে প্রভাব তৈরি করাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ।
প্রশ্ন: গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি কী ছিল?
আবিদুল ইসলাম: দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভই ছিল প্রধান শক্তি। নির্যাতন, বঞ্চনা ও অব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল; কিন্তু তারা প্রকাশের পথ পাচ্ছিল না। কোটা আন্দোলন সেই সুযোগ তৈরি করে। এটি ক্ষোভকে দৃশ্যমান করে এবং ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক চেতনার দিকে নিয়ে যায়।
প্রশ্ন: রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোর ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
আবিদুল ইসলাম: এই আন্দোলন পুরোপুরি অরাজনৈতিক ছিল না। সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন কর্মীদের সমন্বয়ই ছিল এর বৈশিষ্ট্য। ৯ জুনের পর আমি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। একে অপরকে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নিই। তখনই ধারণা করি, আন্দোলন ‘এক দফা’র দিকে যেতে পারে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রাণশক্তি হলেও সংগঠন, কৌশল ও দিকনির্দেশনায় রাজনৈতিক কর্মীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ‘রাজাকার’ ইস্যু বা ‘স্বৈরাচার’ স্লোগানের মতো বিষয়গুলো সংগঠিত রাজনৈতিক চিন্তার ফল। গণঅভ্যুত্থান কখনো একক নেতৃত্বে হয় না। এটি মানুষের অংশগ্রহণে তৈরি হয়। তবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও লক্ষ্য নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিহার্য ছিল।



