ডেঙ্গু: মায়ের কোলে ফিরেই না ফেরার দেশে পড়ুয়া অরূপ

ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া অরূপ
‘আমাকে একা রেখে চলে গেলি ভাই অরূপ। একসঙ্গে বড় হওয়া। একসঙ্গে অনেক কিছু করব রে ভাই। তোর কি অভিমান ছিল...!’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এভাবে ভাই অরূপ বণিকের জন্য আহাজারি করছিলেন অপূর্ব বণিক দীপ্ত। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে বারবার অরূপ বণিক নিলয়কে উদ্দেশ্যে করে লিখে যাচ্ছেন নিজের ফেসবুক দেয়ালে। পড়ুয়া অরূপ এখন না ফেরার দেশে। কয়েক দিনের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অরূপ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মারা যান। শুক্রবার বাড়ির শশ্মানে তার সৎকার করা হয়।
ডেঙ্গুতেই তার মৃত্যু হয় বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
চট্টগ্রামে সরকারিভাবে এবার সাড়ে ৭ হাজার রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। মারা গেছেন ৪০ জন। অরূপ কোথায় আক্রান্ত হয়েছেন তা নিশ্চিত নয়।
ঢাকার বাংলাবাজারে একটি বইয়ের দোকান করতেন। আর ‘বইপাড়া ডট কম’ নামে একটি অনলাইন পেজ চালাতেন তিনি। সপ্তাহখানেক আগে বাড়ি এসেছিলেন। চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার হাদি ফকিরহাটে তাদের নিজের বাড়ি। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট। অসম্ভব বই পড়ুয়া অরূপের আকস্মিক বিদায় সবাইকে কাঁদাচ্ছে। ফেসবুকে অনেকে তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন।
অপূর্ব ও অরূপ কাকাতো জেঠাতো ভাই। দুজন হরিহর আত্মা। মিরসরাইয়ে একই ভবনে তাদের যৌথ পরিবারের বসবাস। দুজন একসঙ্গে চলাফেরা করতনে। এইতো কদিন আগে কোজাগরি পূর্ণিমার সময় বাড়িতে ঘুরে গেছেন অরূপ। অপূর্ব তখন অসুস্থ। তারও ডেঙ্গু হয়েছিল। এ ছাড়া বাবা অর্জুন বণিকসহ পরিবারের আরও কয়েকজন অসুস্থ ছিলেন।
বাবাকে চট্টগ্রাম নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখানো, শুশ্রূষা করে ঢাকায় ফিরেছিলেন অরূপ। সেখানে যাওয়ার কয়েক দিন পর নিজে জ্বরে আক্রান্ত হন। মা গৌরী বণিক তাকে ডাক্তার দেখানো এবং বাড়িতে আসার জন্য তাগিদ দিচ্ছিলেন। এরপর অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃহস্পতিবার বাড়িতে মা-বাবার কাছে ফিরেছিলেন অরূপ। বাস থেকে মহাসড়কে নামার পর বাবা অর্জুন তাকে ধরে ধরে ঘরে আনেন।
অরূপের জেঠাতো দাদা সুশান্ত বণিক আগামীর সময়কে বলেন, ‘আড়াইটার দিকে ঘরে আসে নিলয়। তখন তার বিধ্বস্ত অবস্থা। সে বলে বাস জার্নির কারণে এমন হয়েছে। এরপর স্নান করেন। আধঘণ্টার মধ্যে সে জানায় তার বুকে কেমন জানি লাগছে। চোখ মুখ উল্টে ফেলেছিল। আমি শুধু তাকে বলেছি নিলয়— আমাদের একটু সুযোগ দে। হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। সুস্থ হয়ে যাবি। আমি, কাকি ও অন্যরা মিলে সিএনজি অটোরিকশায় হাসপাতালে নিয়ে যাই। ডাক্তার বললেন, নিলয় আর নেই।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, ডেঙ্গুজ্বরেই তার মৃত্যু হয়েছে। জ্বর চলে যাওয়ায় অরূপ ভেবেছিলেন সুস্থ হয়ে যাবেন। এটিই কাল হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
অরূপ ২০২০ সালে কভিডের সময় ফেনীতে কলেজে পড়তেন। কভিডকালে তিনি ও দুই বন্ধু বইপাড়া ডট কম নামে একটি বইয়ের অনলাইন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেই থেকে বই পড়া, সংগ্রহ এবং বিক্রি এসবে মনোযোগী ছিলেন। সে নেশা থেকেই গড়ে তুলেছিলেন বাংলাবাজারে ছোট একটা দোকান।
অরূপের দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। স্নাতক পাস করা অরূপেরও বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। এখন ছেলের স্মৃতিচিহ্ন আকঁড়ে শুধু বিলাপ করছেন মা গৌরী বণিক।
যে ছেলেকে আধঘণ্টা আগে ঘরে এনেছে শুশ্রূষা করবে বলে, সে এভাবে চলে গেল— কোনোভাবেই মানতে পারছেন না বাবা অর্জুন বণিক।
দাদা সুশান্ত বণিক বলেন, ‘আমদের বাবা-কাকাদের যৌথ পরিবার। সবাই একই ভবনে থাকি। আপন ভাইয়ের মতো বড় হয়েছি আমরা। আমার আরেক কাকতো ভাই অপূর্ব দীপ্তর সঙ্গে অরূপের ভাব বেশি, দুজন সমবয়সী। জ্বরের কথা কাকিমা ও দীপ্ত জানতো। কাকিমা তাকে ডাক্তার দেখাতে এবং বাড়িতে চলে আসতে বলেছিল। কিন্তু সে এসে আর সময় দিল না আমাদের।’
যেন মা-বাবাকে শেষ দেখা দিতেই বাড়ি ফিরেছিলেন অরূপ। তারপর চলে গেলেন। অরূপ বণিক ২০২২ সালে শিল্পী অবিনব শর্মার গানের শিরোনাম দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন ফেসবুকে— ‘ইফ উই এভার স্টপ টকিং সেন্ড মি এ সং।’
অরূপের এই স্ট্যাটাসটি আজ শুক্রবার দুপুরে শেয়ার করে অপূর্ব বণিক দীপ্ত লিখেছেন, ‘আমরা আর কথা বলবনারে ভাই। আর কথা বলবনা।... আর গান পাঠানো হবেনা। ভালো থাকিস।’



