আব্দুল কাদের
ক্রেডিটবাজিই নষ্ট করেছে ঐক্য
- আন্দোলন শুরু যেখানে, সেখানে ফিরে না আসাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল

আব্দুল কাদের
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারির অন্যতম নেতা ছিলেন আব্দুল কাদের। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঐতিহাসিক ৯ দফা ঘোষণা করে আন্দোলনকে নতুন গতি দিয়েছিলেন তিনি। গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর আন্দোলনের অর্জন-অপ্রাপ্তি, ৯ দফা, নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিটন ইসলাম।
আগামীর সময়: গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর ফিরে তাকালে জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষাগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন?
আব্দুল কাদের: দুই বছরে কোনো গণঅভ্যুত্থানের পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের চিন্তায়। আগে ভোটাধিকারহীনতা, দমনপীড়ন কিংবা রাজনৈতিক বঞ্চনাকে অনেকেই স্বাভাবিক বাস্তবতা মনে করতেন। জুলাই সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। মানুষ এখন জানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা যায়। পাশাপাশি রাষ্ট্রসংস্কার নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে।
আগামীর সময়: ৯ দফা ঘোষণাকে ঘিরে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
আব্দুল কাদের: ৯ দফা কোনো ব্যক্তির লেখা নয়; এটি আন্দোলনের বাস্তবতা ও বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনার সমন্বিত ফল। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত ছিল— কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো ‘কে দিয়েছে’ এই প্রশ্নেই আটকে আছি। এতে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য আড়ালে চলে যাচ্ছে। ৯ দফা বিচার, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রসংস্কারের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা, সেটিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আগামীর সময়: গণঅভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, আপনি সেটিকে কীভাবে দেখেন?
আব্দুল কাদের: প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড হচ্ছেন শহীদরা এবং সাধারণ মানুষ। আমরা কয়েকজন শুধু সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছি। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতৃত্ব স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন পরিচালনা করেছে। তাই একজন বা কয়েকজনকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাসকে বিকৃত করে এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
আগামীর সময়: জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আব্দুল কাদের: আন্দোলনের শুরুতে ছাত্রশক্তির পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে এটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পরিণত হয় এবং ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে বিস্তৃত হয়। ছাত্রদল, শিবির, বামসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় ছিল। কর্মসূচি ভাগাভাগি করেই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে।
আগামীর সময়: শীর্ষ সমন্বয়কদের আটক হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব ধরে রাখা কতটা কঠিন ছিল?
আব্দুল কাদের: সেটিই ছিল সবচেয়ে সংকটময় সময়। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুনভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয় এবং ৯ দফা ঘোষণা করা হয়। সেটিই আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। একই সময়ে বুঝতে পারছিলাম, আমিও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছি।
আগামীর সময়: অভ্যুত্থানের পর ছাত্র নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল কী ছিল বলে মনে করেন?
আব্দুল কাদের: আমার মতে, সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আন্দোলনের শেষ পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে না আসা। আন্দোলনের সূচনা যেখান থেকে, সমাপ্তিও সেখানেই হওয়া উচিত ছিল। যদি ছাত্ররা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিত, তাহলে রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসমর্থন আরও শক্তিশালী হতো। কিন্তু তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আগামীর সময়: গণঅভ্যুত্থানের সময় যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেটি এখন কতটা অটুট?
আব্দুল কাদের: দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ঐক্য অনেকটাই ভেঙে গেছে। আন্দোলনের সময় সবাই একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছিল। কিন্তু সফলতার পর শুরু হয়েছে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা। এই ‘ক্রেডিটবাজি’ আন্দোলনের চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে এখনো কোনো কার্যকর রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে ওঠেনি। ফলে ভবিষ্যতে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
আগামীর সময়: গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলা হচ্ছে। এর জন্য কারা দায়ী?
আব্দুল কাদের: সবচেয়ে বড় দায় প্রশাসনের। আন্দোলনের পরপরই নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা উচিত ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা হয়নি। কোথাও অভিযুক্তদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, কোথাও তদন্ত বিলম্বিত হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও। বিচারহীনতার সংস্কৃতি পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।
আগামীর সময়: বর্তমান সরকার জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক বলে মনে করেন?
আব্দুল কাদের: আমার পর্যবেক্ষণ হলো, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই জুলাইকে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার আলোকে ব্যাখ্যা করছে। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি।
আগামীর সময়: ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে?
আব্দুল কাদের: আপাতত নেই। দীর্ঘদিন রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবারকে সময় দিতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, পরিবারের প্রতিও আমার দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমার ভাবনা বাস্তবায়নের যথেষ্ট সুযোগও দেখছি না।
আগামীর সময়: আন্দোলনের দিনগুলোর কোন অভিজ্ঞতা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে?
আব্দুল কাদের: ২১ জুলাই চোখের সামনে পতাকা হাতে এগিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যেতে দেখেছি। যাত্রাবাড়ীতে এক কিশোর তার নিহত বন্ধুর ছবি দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আবার দেখেছি, পথশিশুরাও গুলির মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করছে। এই দৃশ্যগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, জুলাইয়ের প্রকৃত শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের অসাধারণ সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।




