সাইবার বুলিংয়ে থেমে গেছে নারী নেতৃত্ব
- জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারি থেকে নীরব প্রস্থান
- স্বীকৃতির বদলে অপপ্রচার আর ভয়
- রাজপথ থেকে প্রান্তে
- চব্বিশের নারীদের নীরবতার গল্প

ফাইল ছবি
‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা?’— বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উচ্চারণ যেন আবারও ফিরে আসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর। রাজপথে যে নারীরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, স্লোগানে, রক্তে, সাহসে আর নেতৃত্বে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, বিজয়ের পর তাদের অনেকেই আজ নীরব। যে কণ্ঠ একদিন রাজপথ কাঁপিয়েছিল, আজ সেটি চাপা পড়ে গেছে ট্রলের শব্দে, চরিত্রহননের অপপ্রচারে, ধর্মীয় উসকানিতে আর পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির অদৃশ্য দেয়ালে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলেন অসংখ্য নারী। কেউ মিছিলের অগ্রভাগে, কেউ অবরোধে, কেউ আহত ব্যক্তিদের সেবায়, কেউ সাংগঠনিক সমন্বয়ে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করেছেন। অনেক জায়গায় নারীরাই ছিলেন আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখ। কিন্তু সরকার পতনের পর দৃশ্যপট বদলে গেছে। আন্দোলনের সেই নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ এখন রাজপথ, সংগঠন, এমনকি জনপরিসর থেকেও অনেকটাই সরে গেছেন; কিংবা নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, আন্দোলনের সময় যে সাহস ও ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছিল, বিজয়ের পর তার স্বীকৃতি মেলেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, চরিত্রহনন, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা, রাজনৈতিক তকমা দেওয়া এবং নানামুখী অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে। অনেকের ভাষায়, পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক বিভাজনের চাপে তাদের জন্য নেতৃত্বের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক শান্তা ইসলাম বলেছেন, আন্দোলনের সময় তারা সামনের সারিতে থেকে কাজ করলেও সরকার পতনের পর ধীরে ধীরে তাদের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।
তার ভাষায়, ‘আমরা সাংস্কৃতিক চর্চা করতাম, তখন হিজাব পরতাম না। এটা নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের বুলিং করা হয়েছে। বিভিন্ন গ্রুপে মেসেজ, পুরনো ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এমনকি কয়েকজনকে ছাত্রলীগের ট্যাগও দেওয়া হয়েছে।’
শান্তার অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নানা অনুষ্ঠান হলেও নারী নেতৃত্বকে সেখানে প্রায় ডাকাই হয় না। তিনি বললেন, ‘আমরা সুনীতি শান্তি হল থেকে যে ভূমিকা রেখেছি, তার জন্য একটি ধন্যবাদপত্রও পাইনি। পরে হলে কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি জানালে আমাদের নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে। এতকিছুর পর মনে হয়েছে, আর এসবের সঙ্গে জড়ানোর কোনো মানে নেই। এখন পড়াশোনা শেষ করছি, তাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি।’
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি জানালেন, আন্দোলনের সময় দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভাজন, আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের আক্রমণাত্মক মন্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির মুখে পড়তে হয় তাকে।
তিনি বলেছেন, ‘মনে করেছিলাম, তখন আন্দোলনে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, তাই অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর নানা ধরনের মন্তব্য ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছে। এরপর আমার একাডেমিক ফলও ভালো হয়েছিল। তাই পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই এবং ধীরে ধীরে সরে আসি।’ তিনি আরও জানালেন, আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কটূক্তির শিকার হন। সে অভিজ্ঞতার পর আর কোনো গণমাধ্যমে কথা বলেননি।



