জুলাইয়ের চেতনা মলিন হতে দেবে না বিএনপি
- আওয়ামী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ
- জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথেই রয়েছে সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও এর চেতনা ও অর্জন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি বলছে, গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রসংস্কার বাস্তবায়নের পথেই এগোচ্ছে দেশ। দলটির দাবি, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে আর জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের কাজও চলছে।
বিএনপির মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনামলে দুর্নীতি, দুঃশাসন, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। দলটির নেতারা মনে করছেন, বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে সেই আন্দোলন সফল হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পাশাপাশি উন্মুক্ত হয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ।
দলটির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য, জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, দেশে এখন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে, মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে। পাশাপাশি গণমাধ্যম পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে বলেও দাবি তাদের।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন আগামীর সময়কে বললেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে এবং সরকারকে সমালোচনা করার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হবে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে। তবে ১৬ বছরের শাসনের প্রভাব অল্প সময়ে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে আহত ও নিহত সবাইকে পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। এজন্য কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, তাদের অবদান রাষ্ট্র কখনো ভুলবে না।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মতো এখন আর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম, খুন, ক্রসফায়ার, ব্যাংক লুট বা অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে না। তার ভাষায়, সরকারের মাত্র কয়েক মাস হয়েছে; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে রিজভী বলেছেন, আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাই একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন যে আন্দোলনের পেছনে বিএনপির ভূমিকা রয়েছে। বিএনপির দাবি, জুলাই গণহত্যায় নিহত ৮৭৫ জনের মধ্যে অন্তত ৪২২ জন তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাষ্ট্রসংস্কারের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের অধিকাংশ বিষয় বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং বিরোধী দল অংশ নিলে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার আরও শক্তিশালী হবে। তবে বিরোধী দল না এলেও নির্বাচনী অঙ্গীকার, ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সম্পর্কিত। এর মধ্যে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধানসহ এ ধরনের কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে। তবে এখানে কিছু প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) ছিল। ভিন্নমত থাকলেও দলটি জানিয়েছে, রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে গৃহীত বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি কাজ শুরু করেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জনপ্রত্যাশা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এমন একটি সংবিধান সংশোধন করা হবে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে। তার ভাষায়, জুলাই জাতীয় সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সংবিধানে প্রতিফলিত হবে; আর যেসব বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে, সেগুলো দলীয় অবস্থান অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।




