কিন্তু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
লোকটা খুব ভালো মানুষ। এটি অবশ্য না বললেও চলে। কারণ তিনি নিজেই বলেন। সকালে রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বুঝলেন ভাই, এই দেশে ভালো কিছু হবে না। কিচ্ছু না।’
দেশ নিয়ে তার হতাশা নতুন কিছু নয়। তবু আমি কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তার কণ্ঠে আরও হতাশা, ‘এ দেশের মানুষের মধ্যে কোনো নীতিবোধ নেই। ভালো চিন্তা কারও মাথায় আসে না। সারা দিন শুধু অপকর্মের চেষ্টা।’
কথা শেষ হতেই তিনি রাস্তার পাশের ফুলগাছ থেকে একটা ফুল ছিঁড়লেন। আমি বললাম, ‘ফুলটা ছিঁড়লেন কেন?’
তিনি অবাক হলেন। তার পাল্টা প্রশ্ন, ‘একটা ফুল ছিঁড়লে কিছু হয় নাকি?’
আমি কোনো জবাব দিলাম না। মনে হলো তার কথাই ঠিক। রাস্তার ফুল ছিঁড়লে এমন কী হয়। তা ছাড়া লোকটা ভালো মানুষ। অতিরিক্ত ভালো। অন্যের নীতির প্রশ্নে আপসহীন।
অফিসে তিনি সাধারণত একটু দেরি করেই আসেন। তার দেরি করে আসাটা যুক্তিসংগত। বাসায় কত কাজ! রাস্তায় কত জ্যাম! তবে অন্যের দেরি তিনি সহ্য করতে পারেন না। সহকর্মীদের সামনে মাঝেমধ্যেই শোনা যায় তার বজ্রকণ্ঠ, ‘এই দেশে কেউ ঠিকমতো কাজ করে না। সব ফাঁকিবাজ। কাজ না করার ধান্দা।’
অফিসে ঢুকেই তিনি চা খান, বিস্কুট খান। আত্মীয়স্বজনকে ফোন দেন। তারপর মিনিটপাঁচেক চোখ বন্ধ রাখেন। মেডিটেশন না। দেশ নিয়ে ভাবনা চলে কিছুক্ষণ। ভাবনার মধ্যেই দীর্ঘশ্বাস আসে। মাথায় রাগ উঠে যায়। তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েই অফিসের কাজ চলতে থাকে।
তিনি নিয়ম খুব ভালোবাসেন। তবে সেটি অন্যের জন্য। নিজের বেলায় বাস্তববাদী। রাস্তায় বেরিয়েই হুংকার ছাড়েন, ‘এই দেশে কেউ আইন মানে না।। সব অসভ্য। সরকারের উচিত পেটানো। পিটিয়ে ছাল ওঠালেই লাইনে আসবে সবাই।’
তার বাইক রং সাইড দিয়েও চলে। জ্যাম থাকলে ফুটপাতেও উঠিয়ে দেন। ব্যাপারটা তার কাছে যৌক্তিকই মনে হয়। সময়ের মূল্য অনেক। জ্যামের মধ্যে বসে থাকলে দেশ চলবে কীভাবে!
লোকটার ফেসবুক আইডি খুব নৈতিক। স্ট্যাটাসগুলো রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিদিন দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি দুর্নীতিবাজদের কবর রচনা করতে চান। তাদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে চান। তবে নিজের কাজ আটকে গেলে অবস্থান যৌক্তিকভাবেই পাল্টে যায়। তিনি কানে কানে জিজ্ঞেস করেন, ‘কাউকে কিছু দিলে কাজটা কি তাড়াতাড়ি হবে?’
আমি লোকটার ওপর রাগ করি না। কারণ লোকটা একজন না, অসংখ্য। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মাঝেমধ্যে নিজেকেও দেখি। আমরা সবাই অদ্ভুত নীতিতে চলি। নিয়ম ভাঙা খারাপ। কিন্তু নিয়মটা যদি আমি ভাঙি, তাহলে সেটি আর নিয়ম ভাঙা হয় না। হয়ে যায় পরিস্থিতি সামলানো।






