প্রাণীদের আচরণ বিশ্লেষণ করে শিকারি শনাক্ত করবে নতুন স্যাটেলাইট
- আইকারাস স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ করছে প্রাণীদের আচরণ
- প্রাণীদের শরীরে লাগানো হয়েছে ছোট জিপিএস ও সেন্সর
- ২০৩০ সালের মধ্যে ১ লাখ প্রাণীকে নেটওয়ার্কে আনার লক্ষ্য রয়েছে
- দক্ষিণ আফ্রিকায় পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার হচ্ছে প্রযুক্তিটি

সংগৃহীত ছবি
নামিবিয়ার একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। শীতের সকাল। চারদিকে ঝোপঝাড় আর খোলা তৃণভূমি। জেব্রা, উইল্ডবিস্ট, স্প্রিংবক আর জিরাফ নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ কয়েকজন মানুষ একটি গাড়ি থেকে নেমে ঝোপের আড়াল ধরে এগিয়ে যায়। তাদের একজনের হাতে রাইফেল। কিছুক্ষণ পর একটি গুলির শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো দৃশ্য।
জেব্রারা ছুটতে শুরু করে, উইল্ডবিস্ট দল বেঁধে পালায়, স্প্রিংবক লাফাতে লাফাতে দূরে সরে যায়। প্রাণীগুলোর আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আতঙ্কের ছাপ। কিন্তু এটি কোনো সত্যিকারের শিকার অভিযান ছিল না। গুলি ছোড়া ব্যক্তিরাও শিকারি ছিলেন না। তারা ছিলেন বিজ্ঞানী। উদ্দেশ্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা— বিপদ দেখলে প্রাণীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং সেই প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করে কি শিকারিদের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব? আজ বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর উত্তর হতে পারে ‘হ্যাঁ’।
প্রাণীদের আচরণই হতে পারে সতর্কবার্তা
বন্যপ্রাণী শিকার বা পোচিং বিশ্বের অনেক দেশের জন্য বড় সমস্যা। বিশেষ করে আফ্রিকায় গণ্ডার, হাতি এবং অন্যান্য বিরল প্রাণী দীর্ঘদিন ধরে শিকারিদের লক্ষ্যবস্তু। শিকারিরা সাধারণত গোপনে জঙ্গলে প্রবেশ করে। অনেক সময় রেঞ্জাররা তাদের উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই প্রাণী হত্যা করা হয়। কিন্তু শিকারিদের উপস্থিতি মানুষের চোখ এড়ালেও প্রাণীদের চোখ এড়ায় না।
জঙ্গলের প্রাণীরা খুব দ্রুত বিপদ বুঝতে পারে। কোনো অচেনা মানুষ, গুলির শব্দ বা সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখলেই তাদের আচরণ বদলে যায়। কেউ দৌড়ে পালায়, কেউ সতর্ক হয়ে যায়, আবার কেউ নির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা এখন এই আচরণগুলোকে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা’ হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
আইকারাস: প্রাণীদের ইন্টারনেট
এই কাজের কেন্দ্রে রয়েছে একটি নতুন স্যাটেলাইট প্রকল্প। যার নাম আইকারাস। এটিকে অনেকে ‘ইন্টারনেট অব অ্যানিম্যালস’ বা প্রাণীদের ইন্টারনেট বলছেন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের প্রাণীদের শরীরে ছোট সেন্সর বা ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগিয়ে তাদের চলাফেরা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা।
সেন্সরগুলো প্রাণীর অবস্থান, গতি, চলাচলের ধরন এবং কিছু ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর সেই তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গবেষকদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে বিজ্ঞানীরা শুধু জানতে পারেন না প্রাণী কোথায় আছে, বরং বুঝতে পারেন সে কী করছে এবং তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে কি না।
কেন জেব্রা আর জিরাফ গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথমে মনে হতে পারে, গণ্ডারকে রক্ষা করতে হলে শুধু গণ্ডারকেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা ভিন্ন। তারা বলছেন, গণ্ডারের আশপাশে থাকা অন্যান্য প্রাণীও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।
ধরুন, কোনো শিকারি জঙ্গলে ঢুকেছে। সে হয়তো এখনো গণ্ডারের কাছে পৌঁছায়নি। কিন্তু তার আগেই আশপাশের জেব্রা, অ্যান্টিলোপ, হাতি বা জিরাফ তাকে দেখে ফেলতে পারে। তখন এসব প্রাণীর আচরণ হঠাৎ বদলে যায়।
বিশেষ করে জিরাফকে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য ‘সেরা প্রহরী’ হিসেবে দেখছেন। কারণ তাদের উচ্চতা বেশি। দূর থেকে বিপদ দেখতে পারে। অনেক সময় তারা পালিয়ে যাওয়ার বদলে স্থির দাঁড়িয়ে বিপদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
যদি একসঙ্গে কয়েকটি জিরাফ একই দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে সেটি বিপদের উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।
প্রাণীদের জন্য স্মার্টওয়াচ
আজকের ট্র্যাকিং প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক উন্নত। একসময় প্রাণীদের গলায় যে ট্র্যাকিং যন্ত্র লাগানো হতো, সেগুলো ছিল ভারী এবং অস্বস্তিকর।
১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি এলকের গলায় প্রায় ১০ কেজি ওজনের ট্র্যাকিং কলার লাগানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখনকার সেন্সর এতটাই ছোট যে, পাখি ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী এমনকি কিছু প্রজাতির প্রজাপতিও এগুলো বহন করতে পারে।
আধুনিক সেন্সরগুলো শুধু অবস্থান জানায় না। এগুলো প্রাণীর চলাফেরা, শরীরের তাপমাত্রা, সক্রিয়তা এবং আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। অনেক গবেষক এগুলোকে প্রাণীদের ‘স্মার্টওয়াচ’ বলেও উল্লেখ করেন।
কীভাবে কাজ করবে সতর্কবার্তা ব্যবস্থা?
ধরা যাক, কোনো এলাকায় কয়েকশ প্রাণীর শরীরে সেন্সর লাগানো আছে। সাধারণ সময়ে তাদের আচরণ মোটামুটি একই রকম থাকবে। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানবেন একটি জেব্রা, গণ্ডার বা হাতি স্বাভাবিক অবস্থায় কীভাবে চলাফেরা করে। কিন্তু হঠাৎ যদি একসঙ্গে অনেক প্রাণী দ্রুত দৌড়াতে শুরু করে, অথবা কোনো নির্দিষ্ট দিকে সরে যায়, তাহলে সেটি অস্বাভাবিক আচরণ হিসেবে ধরা পড়বে।
কম্পিউটার অ্যালগরিদম সেই তথ্য বিশ্লেষণ করবে। যদি দেখা যায় ঘটনাটি সম্ভাব্য বিপদের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাহলে রেঞ্জারদের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাঠানো হবে। অর্থাৎ শিকারিরা গণ্ডারের কাছে পৌঁছানোর আগেই বনরক্ষীরা তাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। শুধু শিকারি নয়, অসুস্থ প্রাণীও শনাক্ত করা সম্ভব।
এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু শিকারি শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেন্সরগুলো প্রাণীদের স্বাভাবিক আচরণের একটি রেকর্ড তৈরি করে। ফলে কোনো প্রাণী হঠাৎ কম চলাফেরা করলে, অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকলে সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
বিজ্ঞানীরা তখন বুঝতে পারেন প্রাণীটি হয়তো অসুস্থ, আহত বা বিপদে পড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সেন্সর থেকে এমনও বোঝা যায় যে, প্রাণীটি মারা গেছে কি না। এ ধরনের তথ্য দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করে।
এরই মধ্যে মিলেছে সাফল্য
দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে এই প্রযুক্তির কিছু ব্যবহার এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।
সেখানে সেন্সরের সাহায্যে ফাঁদে আটকে পড়া বন্য কুকুর শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
পার্কটির কর্মকর্তাদের মতে, শত শত বন্য কুকুরের মধ্যে অনেকগুলোকে সময়মতো উদ্ধার করা গেছে।
এটি দেখিয়েছে যে, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এই প্রযুক্তি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ক্রুগার পার্কে বর্তমানে হাজার হাজার প্রাণীর শরীরে ট্র্যাকিং ট্যাগ ব্যবহার করা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো গণ্ডার, হাতি এবং অন্যান্য বিপন্ন প্রাণীদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দেওয়া।
এখনো রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ
তবে প্রযুক্তিটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। বন্য পরিবেশে কাজ করা সবসময়ই কঠিন। আফ্রিকার বিশাল জঙ্গল ও তৃণভূমিতে সব জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া সহজ নয়। সেন্সরগুলোকে ছোট রাখতে হয়, আবার সেগুলোকে দীর্ঘদিন কার্যকরও রাখতে হয়।
প্রাণীরা কাদা, পানি, ঝোপঝাড় এবং কঠিন পরিবেশে চলাফেরা করে। ফলে যন্ত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট, সেন্সর, অ্যান্টেনা এবং সফটওয়্যার— সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে কাজ করতে হবে। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এখনো উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতের আশা। তবু গবেষকদের আশা অনেক।
তাদের বিশ্বাস, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার প্রাণীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। তখন শুধু গণ্ডার বা হাতি নয়, বিপন্ন অনেক প্রাণীকে আরও কার্যকরভাবে রক্ষা করা যাবে।
প্রাণীদের আচরণকে যদি সঠিকভাবে বোঝা যায়, তাহলে জঙ্গল নিজেই যেন বিপদের খবর দিতে শুরু করবে। একটি জেব্রার হঠাৎ দৌড়, একটি হাতির অস্বাভাবিক চলাফেরা বা কয়েকটি জিরাফের একই দিকে তাকিয়ে থাকা— এসবই হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। আর সেই সংকেতগুলো ধরবে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এটি একটি নতুন অধ্যায়। যেখানে মানুষ শুধু প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করছে না; বরং প্রাণীরাই নিজেদের এবং তাদের সঙ্গীদের রক্ষায় তথ্য সরবরাহ করছে।
হয়তো খুব শিগগিরই জঙ্গলের কোনো কোণে শিকারি পা রাখার আগেই তার উপস্থিতির খবর পৌঁছে যাবে বনরক্ষীদের কাছে। আর সেই খবরের উৎস হবে ভীতসন্ত্রস্ত কোনো জেব্রা, সতর্ক কোনো হাতি কিংবা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি জিরাফ।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি















