প্রতিবন্ধীদের ভরসা হোসনা আক্তার

এলাকার কয়েকজন প্রতিবন্ধী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হোসনা আক্তার
হোসনা আক্তারের উচ্চতা সোয়া তিন ফুট। হাঁটাচলায় কষ্ট, বসতেও হয় অন্যের সহায়তায়। ৩৬ বছর বয়সী হোসনা প্রায় ১০ বছর ধরে এলাকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাছে ভরসার মানুষ হয়ে উঠেছেন।
সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন হোসনা। দিচ্ছেন চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সহায়তা। অংশ নিচ্ছেন বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধি হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামতও দেন তিনি।
হোসনা এলাকার প্রতিবন্ধীদের নিয়ে অগ্রণী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সংস্থাটির সভাপতি তিনি। ২০২৫ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে অদম্য নারী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন হোসনা।
ময়মনসিংহ নগরীর ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কালীবাড়ি এলাকায় হোসনার জন্ম। তার বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কুদরত আলী। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে হোসনা দ্বিতীয়।
হোসনা বললেন, ‘জন্ম থেকেই আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী। আমার শৈশব ছিল অনেক কষ্টের। বেড়ে ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল না। আমার উচ্চতা মাত্র ৩৯ ইঞ্চি।’
হোসনা জানিয়েছেন, তিনি ২০০১ সালে শম্ভুগঞ্জ এলাকার জুটমিল উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণি পাস করার পর আর পড়াশোনা করতে পারেননি। উচ্চতা কম হওয়ায় হোসনার পাশাপাশি তার মা-বাবাকেও সামাজিকভাবে অনেক হেয় প্রতিপন্ন হতে হতো।
প্রায় ১৫ বছর আগে হোসনার পাশে দাঁড়ায় ময়মনসিংহের ‘প্রতিবন্ধী কমিউনিটি সেন্টার’ নামের একটি বেরকারি সংস্থা, সেখানে তিনি নিতে থাকেন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, অংশ নিতে থাকেন বিভিন্ন সামাজিক ও সরকারি অনুষ্ঠানে। একপর্যায়ে অন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা জাগে তার। গড়ে তোলেন অগ্রণী প্রতিবন্ধী কল্যাণ সংস্থা নামে একটি সংগঠন।
হোসনা ২০২১ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। নতুন উদ্যমে এলাকায় শুরু করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক, প্রতিবন্ধীদের ভাতা ও এনআইডি কার্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেলাই প্রশিক্ষণ, হাঁস, মুরগি, গবাদি পশু পালন প্রশিক্ষণ।
হোসনা বলেছেন, তিনি নিজে অথবা কোনো প্রশিক্ষক দিয়ে প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার সংস্থা থেকে সেলাই, হাতের কাজসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার মাধ্যমে এ পর্যন্ত দুই শতাধিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মসংস্থান হয়েছে। সেসব প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এখন তাদের পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করছেন। বর্তমানে চর ঈশ্বরদীয়া ও চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়নের ৮৩৪ প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন তিনি।
আট বছর আগে হোসনা বিয়ে করেছেন। স্বামী মোয়াজ্জেম হোসেন সরকার। তাদের ছয় বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। স্বামীর সামান্য আয়ে চলছে তাদের সংসার।
কালীবাড়ি এলাকার প্রতিবন্ধী সোহেল মিয়া বললেন, হোসনার সহায়তায় তিনি একটি হুইলচেয়ার পেয়েছেন। এতে তার খুব উপকার হয়েছে। মনোয়ারা নামে আরেক নারী জানালেন, তার মেয়ে কারিমা (২৬) বাকপ্রতিবন্ধী। কারিমা কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার পর স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। এখন হোসনার কাছে কারিমা সেলাই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক নাজনীন সুলতানা বললেন, সমাজ উন্নয়ন ও প্রতিবন্ধীদের স্বাবলম্বী করার জন্য হোসনা অদম্য নারী পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি আমাদের সমাজে উদাহরণ হতে পারেন।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেছেন, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে হোসনার কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি অবহিত। হোসনাদের এগিয়ে যাওয়ার যে প্রত্যয়, তা সমাজে অনুকরণীয়। সরকার তাদের পাশে আছে।






