চেরনোবিলের ৪০ বছর
বিকিরণের মধ্যেও কীভাবে টিকে আছে বন্যপ্রাণী?
- ১৯৮৬ সালের বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপ জুড়ে
- মানুষের অনুপস্থিতিতে নেকড়ে, ভালুক ও বাইসনের বেড়েছে সংখ্যা
- চেরনোবিল এলাকায় প্রাণীদের জিনগত পরিবর্তন নিয়ে চলছে গবেষণা

সংগৃহীত ছবি
চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনার ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার কেন্দ্রস্থলের আশপাশে বসবাস করা বন্যপ্রাণীর ওপর এর কী প্রভাব পড়েছে, এটাই সে গল্প।
‘পা-পা-পা-পা-পা!’ গভীর রাত। চারপাশে নিস্তব্ধতা। হঠাৎ অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসে অদ্ভুত এক শব্দ। স্পেনের ডোনানা বায়োলজিক্যাল স্টেশনের বিবর্তন জীববিজ্ঞানী পাবলো বুর্রাকো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন গাছের ফাঁক দিয়ে। সামনে পড়ে আছে ধ্বংসস্তূপ। একসময়কার শক্তিশালী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র; যা ১৯৮৬ সালের বিস্ফোরণে পরিণত হয়েছিল এক দুঃস্বপ্নে। বিস্ফোরণের পর বহু মাইল জুড়ে এলাকা খালি করে দেওয়া হয়েছিল। মানুষ আর ফেরেনি। প্রকৃতি অবশ্য থেমে থাকেনি।
মাথার টর্চের আলোয় পথ দেখে তিনি এগোলেন শব্দের দিকে। কাছে যেতেই দেখা গেল, একটি ছোট পুরুষ গাছব্যাঙ সঙ্গীর জন্য মরিয়া হয়ে ডাকছে। এক ঝটকায় তিনি ব্যাঙটিকে ধরে ফেললেন। মাত্র ৫ সেন্টিমিটার লম্বা সেই প্রাণীটি তার হাতের মুঠোয় কাঁপছিল। সালটি ছিল ২০১৬। এই বিপজ্জনক অঞ্চলে তার প্রথম গবেষণা সফর।
ব্যাঙটির দিকে তাকিয়ে বুর্রাকো লক্ষ্য করলেন এক অদ্ভুত ব্যাপার। এর রঙ অন্যদের তুলনায় গাঢ়। দূরের এলাকায় থাকা একই প্রজাতির ব্যাঙগুলোর মতো নয়। ‘এটা ছিল অসাধারণ উত্তেজনাপূর্ণ’— বললেন তিনি।
এই ছোট্ট প্রাণীটি যেন এক বিশাল প্রশ্ন তুলে ধরেছিল— চেরনোবিলের বিকিরণ কি সত্যিই আশপাশের প্রাণীদের বদলে দিয়েছে?
বিস্ফোরণ, ধুলা, আর দীর্ঘ ছায়া
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল। চেরনোবিলের চার নম্বর রিঅ্যাক্টর বিস্ফোরিত হয়। মুহূর্তেই আকাশে ছড়িয়ে পড়ে বিপুল তেজস্ক্রিয় পদার্থ। বাতাসে ভেসে সেই ধুলা পৌঁছে যায় যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, এমনকি উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশেও।
দুর্ঘটনার কারণ ও মৃত্যু
এই দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয় একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময়। ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও মানবিক ভুলের কারণে রিঅ্যাক্টর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে দুজন শ্রমিক মারা যান। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে তীব্র বিকিরণজনিত অসুস্থতায় আরও ২৮ জন কর্মী ও উদ্ধারকর্মীর মৃত্যু হয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন সংস্থার অনুমান, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী। কিছু উপাদান কয়েক বছরেই ক্ষয় হয়, কিন্তু সিজিয়াম-১৩৭ ও স্ট্রনশিয়াম-৯০-এর মতো উপাদান প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। আবার প্লুটোনিয়ামের মতো উপাদান হাজার বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে চেরনোবিলের কিছু এলাকা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলের সেই ভূখণ্ড। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকা। আজও সেখানে তীব্র তেজস্ক্রিয় ‘হটস্পট’ রয়ে গেছে।
চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর ঠিক কতসংখ্যক বন্যপ্রাণী মারা গিয়েছিল, তার নির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বিস্ফোরণের পরপরই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
বিশেষ করে রিঅ্যাক্টরের কাছাকাছি বনভূমি, যা পরে ‘রেড ফরেস্ট’ নামে পরিচিত হয়। সেখানে উচ্চমাত্রার বিকিরণে অসংখ্য পোকামাকড়, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী মারা যায়। গাছপালাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক পাইন গাছ শুকিয়ে লালচে হয়ে যায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে অনেক প্রাণী আবার সেখানে ফিরে আসে এবং নতুন করে বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে।
প্রথমদিকে আশঙ্কা ছিল, এই বিকিরণ সবকিছু ধ্বংস করে দেবে। মানুষ দ্রুত এলাকা ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু প্রাণীরা তো যেতে পারেনি। চার দশক পর দেখা যাচ্ছে; ৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত নিষিদ্ধ অঞ্চলের ভেতর অনেক প্রাণী দিব্যি টিকে আছে। কেউ কেউ তো সংখ্যায়ও বেড়েছে। তবে গল্পটা এত সরল নয়।
অদ্ভুত পরিবর্তনের খোঁজে গবেষকরা
বছরের পর বছর ধরে নানা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছেন। বিকৃত গাছ, টিউমারে আক্রান্ত পাখি, আর সেই রহস্যময় কালো ছত্রাক; যা এখনো রিঅ্যাক্টরের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বেঁচে আছে। প্রশ্ন উঠেছে— এগুলো কি বিকিরণের ফল? নাকি অন্য কোনো কারণ?
বুর্রাকো ও তার সহকর্মীরা বহু বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। তারা চেরনোবিল ও আশেপাশের এলাকা থেকে ২৫০টিরও বেশি গাছব্যাঙ সংগ্রহ করেছেন।
২০২২ সালে প্রকাশিতব্য তাদের গবেষণায় দেখা যায়, নিষিদ্ধ অঞ্চলের ব্যাঙগুলো গড়ে বেশি গাঢ় রঙের। তাদের ধারণা, এই গাঢ় রঙের পেছনে থাকা মেলানিন হয়তো বিকিরণের বিরুদ্ধে এক ধরনের ঢাল হিসেবে কাজ করে। ফলে যেসব ব্যাঙ গাঢ় ছিল, তারা হয়তো টিকে থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে।
তবে বুর্রাকো নিজেও বলেছেন, ‘এটি এখনো একটি অনুমান, প্রমাণ নয়।’
বিতর্কের ভেতর বিজ্ঞান
সবাই অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে রাজি নন। যুক্তরাষ্ট্রের জীববিজ্ঞানী টিমোথি মুসোর মতে, ব্যাঙের নমুনা যথেষ্ট বিস্তৃত নয়। তার দাবি, গাঢ় রঙের সঙ্গে বর্তমান বিকিরণের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
বুর্রাকো পাল্টা যুক্তি দেন, তারা বিভিন্ন মাত্রার বিকিরণ থাকা এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন, যেগুলোর পরিবেশ প্রায় একই। অন্যদিকে, ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওবায়োলজিস্ট কারমেল মাদার্সিল বলেছেন, ‘গবেষণাটি পদ্ধতিগতভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী এবং গবেষকরা ফল ব্যাখ্যায় সতর্ক ছিলেন।’
আসলে চেরনোবিলের বন্যপ্রাণী নিয়ে এমন মতবিরোধ বহুদিন ধরেই চলছে। একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য— তা কি বিকিরণের কারণে, নাকি ভারী ধাতুর মতো অন্য দূষণের কারণে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুব কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে, চেরনোবিলের আশপাশে থাকা বেওয়ারিশ কুকুরদের জিনগত বৈচিত্র্য নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক রয়েছে। একইভাবে, ব্যাংক ভোল নামের ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায় জিনগত বৈচিত্র্য বেশি। এটি বিকিরণের কারণে হতে পারে, আবার অন্য কারণেও হতে পারে।
বদলে যাওয়া বন ও জীবন
মাদার্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন— পরিবেশ নিজেই বদলে গেছে। বিকিরণের কারণে অনেক পাইন গাছ মারা যায়। তাদের জায়গা দখল করে বার্চ গাছ। ফলে পুরো বনভূমির চরিত্রই বদলে যায়।
তিনি বলেছেন, ‘এখনো গাছপালা আর প্রাণীতে ভরপুর, কিন্তু আগের মতো নয়। এই পরিবর্তিত পরিবেশেই প্রাণীরা নিজেদের মতো করে মানিয়ে নিয়েছে।’
মানুষ নেই, প্রাণীর রাজত্ব
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন মানুষের অনুপস্থিতি। যেখানে আগে মানুষ চলাফেরা করত, এখন সেখানে ঘুরে বেড়ায় নেকড়ে, ভালুক আর বাইসন। হরিণ, বন্য শূকর আর এল্কের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
নেকড়ের সংখ্যা আশপাশের সংরক্ষিত এলাকার তুলনায় সাত গুণ বেশি। সম্ভবত শিকারের প্রাচুর্যের কারণে। দীর্ঘদিন হারিয়ে থাকা ইউরেশিয়ান লিংক্সও আবার ফিরে এসেছে।
২০১৪ সালে ক্যামেরায় ধরা পড়ে একটি বাদামি ভালুক; যা এই অঞ্চলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় দেখা যায়নি। আর আছে কুকুরেরা, ১৯৮৬ সালে ফেলে যাওয়া পোষা প্রাণীদের বংশধর। এখনো তারা সেই এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, আর কিছু নিরাপত্তারক্ষী তাদের দেখাশোনা করেন।
অভিযোজন নাকি কাকতাল?
প্রশ্নটা এখনো ঝুলে আছে, এই প্রাণীরা কি সত্যিই বিকিরণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিবর্তিত হয়েছে? ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, চেরনোবিলে জন্মানো সয়াবিন বিকিরণ ও ভারী ধাতুর চাপ সহ্য করতে সক্ষম হয়েছে।
ব্যাংক ভোল প্রাণীগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা ডিএনএ ক্ষতির বিরুদ্ধে বেশি প্রতিরোধী। রিঅ্যাক্টরের ভেতরের কালো ছত্রাক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। দেখা গেছে, গাঢ় রঙ তাদের বিকিরণ সহ্য করতে সাহায্য করতে পারে।
তবে একটি দাবি, এই ছত্রাক বিকিরণ থেকে শক্তি সংগ্রহ করে, এটির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রজন্ম পেরিয়ে পরিবর্তন
মাদার্সিলের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনগুলো কি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যাচ্ছে? ২০০৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংক ভোলের ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা প্রজন্ম ধরে বজায় থাকে এমনকি যখন তাদের দূষণমুক্ত পরিবেশে রাখা হয়।
তবে সব প্রাণী সমানভাবে টিকে নেই। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিকিরণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ প্রভাবে বার্ন সোয়ালো পাখিদের ওপর চাপ বাড়ছে। এতে তাদের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
প্রভাব শুধু চেরনোবিলেই সীমাবদ্ধ নয়
চেরনোবিলের প্রভাব শুধু ওই এলাকায়ই সীমাবদ্ধ নয়। পোল্যান্ডের খাবারযোগ্য মাশরুম, যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া ব্লুবেরি, এমনকি গ্রিসে ব্যবহৃত জ্বালানি কাঠেও এখনো সামান্য তেজস্ক্রিয় উপাদান পাওয়া যায়।
গবেষকদের মতে, চেরনোবিলের গল্পকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি না পুরোপুরি ধ্বংসের গল্প, না পুরোপুরি পুনর্জাগরণের। বরং এটি অসংখ্য সূক্ষ্ম পরিবর্তনের গল্প। একটি বাস্তুতন্ত্রের, যা ভয়াবহ বিপর্যয়ের পরও বেঁচে আছে, বদলেছে, আবার নতুনভাবে গড়ে উঠেছে।
চার দশক পরও এই ভূমিতে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আর হয়তো সেটাই এ গল্পের সবচেয়ে সত্য অংশ।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি





