প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে চলছে বর্ণ

ছবি আঁকছে বর্ণ। ছবি: আগামীর সময়
জীবনে প্রতিকূলতাকে জয় করে কেউ এগিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। প্রতিবন্ধকতা জয় করে যারা এগিয়ে যায়, তেমনই এক শিশুশিল্পী সাবা ইসলাম বর্ণ (১৪)। কথা বলা বা শোনার ক্ষমতা নেই; কিন্তু বর্ণ তার মনের সব কথা বলে তুলির আঁচড়ে।
এই খুদে শিল্পী মুক্তাগাছার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। জলরঙ, পেনসিল স্কেচ— সব মাধ্যমেই স্বচ্ছন্দ সে। প্রতিকূলতাকে জয় করে এ বয়সেই এঁকেছে কয়েকশ ছবি।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কাঠগড়া গ্রামের এ শিল্পী এখন জাতীয় পর্যায়েও সাফল্য পাচ্ছে। ২০২৩ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে প্রথম হয় বর্ণ। একই বছর ঢাকা বিভাগে প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্যাটাগরিতে অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান। ২০২৩ সালেই টাঙ্গাইলে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় সে প্রথম স্থান অর্জন করে। ২০২৬ সালে জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহে ময়মনসিংহ জেলার প্রতিযোগিতায় অর্জন করে দ্বিতীয় স্থান।
সম্প্রতি ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে নিজের আঁকা ছবি উপহার হিসেবে তুলে দেয় বর্ণ।
বর্ণর বাবা শফিকুল ইসলাম চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। মা মুসলিমা খাতুন স্বপ্না গৃহিণী। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে বর্ণ বড়।
বর্ণর মা বললেন, ‘মেয়েটা সময় পেলেই বাইরে যায় ছবি আঁকতে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিরিবিলি বসে কল্পনা করতে ভালো লাগে ওর। ইশারায় বলে, নদীর পাড়ে যাব। সেখানে নিয়ে গেলে দেখে দেখে ছবি আঁকে।’ বলতে বলতে তিনি দেখালেন, গোধূলিবেলায় বাড়ি ফিরছে ক্লান্ত কৃষক, নদীতে নৌকা চলা, নদী থেকে গ্রামের বধূর পানি আনার দৃশ্যসহ বর্ণর আঁকা বিভিন্ন ছবি।
‘বর্ণর বয়স তখন এক বছর, উঠানে বসিয়ে রাখলে হাতের কাছে যা পেত তা দিয়েই আঁকিবুঁকি করত। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু একটা দেখলেই তা খাতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করত’— বলছিলেন বর্ণর মা।
বাবার চাকরিসূত্রে ছোটবেলায় বর্ণরা টাঙ্গাইল থাকত। সেখানকার হাইকেয়ার বধির স্কুলে পড়াশোনা শুরু তার। আঁকাআঁকিতে মেয়ের আগ্রহ দেখে মা তাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন টাঙ্গাইল শিশু একাডেমিতে। এরপর নজরুল সেনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পিএসসি পাসের পর তার ঠিকানা হয় মুক্তাগাছা আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।
গত বছর বসুন্ধরা গ্রুপের দেশব্যাপী ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় পঞ্চম স্থান অর্জন করে বর্ণ। তার ঘরের শোকেসটি ঠাসা পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ক্রেস্ট, মেডেল আর নিজের আঁকা ছবিতে। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে হরেক রকম চিত্রকর্ম।
বর্ণর ছবি আঁকার শিক্ষক তাপস মজুমদার বললেন, বর্ণ খুবই মেধাবী ও সৃজনশীল। এ পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতাগুলোর বেশিরভাগেই প্রথম হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়েও হয়েছে পুরস্কৃত। এখন সে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না, সাধারণ প্রতিযোগীদের সঙ্গেই অংশ নেয় প্রতিযোগিতায়।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বললেন, বর্ণ যখন এ বছর নজরুল জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ময়মনসিংহে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় (উন্মুক্ত) প্রথম হয়, তখন তিনি জানতে পারেন সে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বর্ণর জন্য সবসময় আমাদের শুভকামনা থাকবে।




