বিশ্বকাপ ডায়েরি
টেনিস কোর্টে ফুটবলের দাপট!

ছবি: আগামীর সময়
ফ্ল্যাশিং মিডোর সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে। কত শতবার ভেবেছি যুক্তরাষ্ট্র এলে এই কোর্টে ফেদেরার আর নাদালের একটা ম্যাচ দেখব, ইউএস ওপেনের মহাকাব্যিক এক লড়াইয়ের সাক্ষী হব। ভাগ্যদেবী ঠিকই করোনা পার্কের বিলি জিন ন্যাশনাল টেনিস কোর্টের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল, তবে ততদিনে ফেডেক্স-রাফা টেনিস ব্যাট নামিয়ে রেখেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের কুইন্স অঞ্চলের ফ্যান জোন এটি। মেক্সিকো আর দক্ষিণ আফ্রিকার খেলা দেখতে হাজির প্রায় ১৪ হাজার দর্শক। বেশিও হতে পারে। কারণ আসন ছাড়াও অনেকে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এ যেন এক রঙের দুনিয়া। মেক্সিকান-আফ্রিকান ফ্যানরাই শুধু এসেছে ভাবলে ভুল হবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার ভক্ত সংখ্যাও কম নয়। সবার মুখেই স্ফিত হাসি। যেন পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্ট বলে কিছু নেই। ফুটবল ব্যাপারটাই এমন। আর ফুটবলের সঙ্গে যখন বিশ্বকাপ শব্দটা যুক্ত হয়ে যায়, তখন পুরো পৃথিবী একই ছাদের নিচে চলে আসে।
হাতে ট্রাইপড আর বুম নিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কোথা থেকে শুরু করা যায়। আগামীর সময়-এর ফেসবুক পেজে লাইভ করার গুরু দায়িত্ব সবার আগে পালন করতে হবে। তারপর আরাম করে বসে দেখা যাবে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ। তখনই মেক্সিকোর জার্সি পরা সাদা চামড়ার এক দীর্ঘদেহী লোক এগিয়ে এলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আর ইউ জার্নালিস্ট? মাই নেইম ইজ রজার।’ স্পষ্টভাষী এবং মুখে মিষ্টি হাসি। কথা বলার ধরন বলে দিচ্ছে মেক্সিকান নন। দেখে মনে হচ্ছে চল্লিশের ঘর পেরিয়েছেন। হাতে থাকা বিয়ারের বোতলে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘মেক্সিকোর জার্সিটা সুন্দর দেখে কিনেছি। আজ ওরাই জিতবে। দে আর গুড টিম। কিন্তু আমার চোখে ফাইনাল খেলবে ফ্রান্স আর স্পেন। আমি বাজি ধরতে পারি, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কেউই ফাইনাল খেলবে না।’
ফ্যান জোনের এক পাশে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ফুটবলে লাথি মারছে এক দল ভক্ত। বিশাল বড় এক পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সামনে। কিক মারলে সেই বল গিয়ে পর্দায় আটকে যায়। পর্দায় কি আঠা লাগানো নাকি? আজব ব্যাপার! কার নিশানা কত ভালো, সেটাই সবাই ঝালিয়ে নিচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার হাতেগোনা সমর্থক সঙ্গী করে বিশাল এক মেক্সিকান গ্রুপ নাচছে আরেক পাশে। জোরে জোরে শাকিরার গান বাজছে। সেই তালে তালে দুলছে সবাই। তাদের চারপাশে আবার আরেক দল সেই নৃত্য মোবাইল ফোনে ধারণ করছে। ফ্যান জোনেই এ অবস্থা। ভাবছি মেক্সিকো সিটিতে কী চলছে? বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের ভেন্যু তো ওটাই।
আর্জেন্টিনার জার্সি পরা বাবা-মা আর এক ছেলের দেখা মিলল। সিঙ্গাপুর থেকে এসেছেন তারা। মেসি ফ্যান কি না জানতে চাইতেই একগাল হেসে জবাব দিল, ‘অবশ্যই। মেসি ছাড়া আর কেইবা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়, বলো? তবে আর্জেন্টিনার জন্য এবার কাপ জেতা কঠিন। আনচেলত্তির ব্রাজিলকেই আমার ভয়। কত বছর কাপ জেতে না ব্রাজিল। দলটাও দারুণ। আনচেলত্তি হতে পারেন মাস্টারমাইন্ড।’
খাবারের দোকান দিয়ে ভরা ফ্ল্যাশিং মিডো। লোকে লোকারণ্য একেকটা দোকান। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ১০০ টাকার পানি আর ৩০০ টাকার বার্গারের কথা মনে পড়ে গেল। এখানে কেমন দাম হবে? মূল্য তালিকার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! ন্যূনতম ১৩ ডলার। সবচেয়ে দামিী খাবারের দাম ২৫ ডলার। ১৫ ডলারের নিচে কোনো বিয়ার নেই। মূল্যতালিকা মনে করিয়ে দিল, সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ এটি। পকেটে যার পয়সা নেই, তার এই খেলা দেখার সুযোগও নেই।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-০ গোলের সহজ জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু হলো মেক্সিকোর। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মেক্সিকান ফকলোরিকো (ঐত্যিহ্যবাহী মেক্সিকান নাচ) ড্যান্স শুরু। সেই নাচ থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই। আজ তো ওদেরই দিন। জয় দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু মানে পুরো বিশ্বই আপনার হাতের মুঠোয়।
গ্রুপ পর্বের সব দিন ওপেন থাকবে ফ্ল্যাশিং মিডো। তাই বলে ফুটবল ভক্ত হিসেবে ঢুকে পড়ার সুযোগ মিলবে না সবার। বিখ্যাত এই টেনিস কোর্টে খেলা দেখতে হলেও আপনার কাছে থাকতে হবে টিকিট। সেই টিকিটও সোল্ড আউট বিশ্বকাপ শুরুর সপ্তাহখানেক আগে। ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় হারানোর সুযোগটা হেলায় হারাবে কেন নিউ ইয়র্কবাসী!




