‘হাসিনা ইস্যুতে’ আটকে গেল প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর!

গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত আনা নিয়ে ঢাকা-দিল্লির টানাপড়েনের মধ্যেই অনিশ্চয়তায় পড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর। আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুদিনের সফরে তার দিল্লি যাওয়ার কথা শোনা গেলেও এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, সফরের আগে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া জরুরি। আর সে পরিবেশ তৈরির অন্যতম শর্ত হিসেবে সামনে এসেছে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি।
আজ রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব এ কে এম শহীদুল করিম বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ চলছিল। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর সে প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটেছে।
তিনি বললেন, সফরের জন্য একটি উপযুক্ত ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এজন্য শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদেরও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা।
অবশ্য কয়েক দিন আগেও তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ছিল বেশ ইতিবাচক আলোচনা। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর আসে, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি দুদিনের সফরে দিল্লি যেতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ঢাকার কর্মকর্তারাও গত সপ্তাহে সফরের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন।
গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেটিই ছিল তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আশা প্রকাশ করেছে, ভারত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করবে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনারও আলোচনাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ভারতের আমন্ত্রণ আগে থেকেই রয়েছে এবং ভারতীয় জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আরও কৌতূহল তৈরি হয় বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পর। ঢাকায় সাক্ষাৎ শেষ করেই দিল্লি গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেন ত্রিবেদী। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হয়। কিন্তু এর মধ্যেই শেখ হাসিনা ইস্যুতে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রত্যর্পণের অনুরোধও করেছে বাংলাদেশ। তবে দিল্লির অবস্থান এখন পর্যন্ত অনেকটাই কৌশলী ও সংযত।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানালেন নরেন্দ্র মোদি। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ সদস্য না হলেও বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আউটরিচ অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে এই আমন্ত্রণ নিয়েও ঢাকার সন্তুষ্টির পুরোটা প্রকাশ পায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, ‘চেয়ারপারসন অব বিমসটেক’ হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এরপর গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণের পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে তারেক রহমানের দিল্লি সফরের বিরোধিতায় সরব হয়েছে বিরোধী দলও। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নির্ধারণ করা হবে— এ প্রশ্নগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমান ভারতে যেতে পারবেন না।
সব মিলিয়ে একদিকে ভারতের আমন্ত্রণ, অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ— এই দুইয়ের টানাপড়েনে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর।







