বিনিয়োগ রপ্তানিতে বিপদসংকেত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সর্বনাশের ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস না পেয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে শিল্পকারখানাগুলো। আবার কোনোটি এরই মধ্যে বন্ধ হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে— এমন শঙ্কা শিল্পমালিকদের। তাদের ভাষ্য, এমন পরিস্থিতি আর কয়েক দিন চললেই সময়মতো পণ্য বিদেশে পাঠানো সম্ভব হবে না। দেউলিয়া হতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে বাড়বে ব্যাংকঋণের বোঝা। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে সৃষ্টি হয়েছে বড় ধরনের বাধা। শুধু তাই নয়, বিরূপ প্রভাব পড়েছে খাদ্যপণ্য উৎপাদনেও। ফলে অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে নিত্যপণ্যের বাজার।
এদিকে গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে গতকাল শনিবারও শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, হবিগঞ্জ, নরসিংদীতে ভারী শিল্পের অনেকগুলোর উৎপাদন এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে। কারখানা চালু রাখার
জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া যাবে— এমন নিশ্চয়তা পাননি বলে জানিয়েছেন একাধিক শিল্প গ্রুপের মালিক।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জুলাই ও আগস্টের বিদ্যুৎ বিল আগামী ১২ মাসে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে চিঠি দিয়েছে বিকেএমইএ। সেখানে বলা হয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটে উৎপাদন ব্যাহত এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। ফলে তাদের জন্য জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়েছে।
রপ্তানিতে শঙ্কা: বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। আর পোশাকের উৎপাদন শুধু সেলাই মেশিনে সীমাবদ্ধ নয়। সুতা, কাপড়, ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, আয়রনিং, প্যাকেজিং— পুরো সরবরাহ চেইন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। গ্যাসসংকটে এই চেইনের একটি ধাপ থেমে গেলেই পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া আটকে যায়। ফলে সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন অর্ডার নেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক হচ্ছে। শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প দেশ খুঁজতে পারেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস না থাকলে কারখানা চালাতে হয় ডিজেল দিয়ে। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। উৎপাদন কমলেও শ্রমিক, কারখানা, ব্যাংকঋণ, সুদ, ভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় কিন্তু একই থাকে। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে প্রতি ইউনিট পণ্যের খরচ বাড়ছে। সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা ইচ্ছামতো এ বাড়তি খরচ ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) আগামীর সময়কে বলেছেন, সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো রপ্তানি ও শিপমেন্ট সম্ভব হবে না। এতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে দেউলিয়া হতে পারে এবং ব্যাংকের দায় বাড়তে পারে।
তিনি আরও বললেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে উদার ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করতে হবে। এলএনজি টার্মিনালের বর্তমান সমস্যা সাময়িকভাবে সমাধান হলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর নিশ্চয়তা নেই। তাই স্থায়ী সমাধানের দিকে নজর দিতে হবে। এ পরিস্থিতি এড়াতে অন্তত তিন-চারটি এফএসআরইউ সার্বক্ষণিক সচল রাখা জরুরি, যাতে একটি বিকল হলেও গ্যাস সরবরাহে বড় ধস না নামে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দ্রুত স্থলভিত্তিক (অনশোর) এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নিত্যপণ্য উৎপাদন ব্যাহত: সম্প্রতি তীব্র গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়েছে ভোজ্য তেল, আটা-ময়দা, চিনি ও লবণের মতো নিত্যপণ্যের কারখানার ওপর। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে নিত্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর বড় প্রভাব পড়বে। এতে সংকট বাড়বে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) সূত্রে জানা গেছে, তাদের গ্রুপের ৬০ থেকে ৭০টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভারী পণ্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ১৫টি কারখানার বেশিরভাগই বন্ধ রয়েছে। কিছু কারখানায় দিনে মাত্র ছয় থেকে সাত ঘণ্টা উৎপাদন হচ্ছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। এতে আটা-ময়দা, তেল, চিনি, লবণসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের কারখানা অচল হয়ে পড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বাজারের চাহিদামতো পণ্য সরবরাহ করা না গেলে দেখা দিতে পারে বড় সংকট।
এ ছাড়া টি কে গ্রুপের ২৯টি কারখানার মধ্যে ৫-৭টি চালু আছে। এতদিন থেমে থেমে চললেও গত বুধবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে বেশিরভাগ কারখানা। ভোজ্য তেল উৎপাদনের দুটি কারখানার মধ্যে একটি কোনোমতে চালু আছে, অন্যটি বন্ধ। স্টিল, পার্টিক্যাল বোর্ড, কেমিক্যালসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের কারখানাগুলোও বন্ধ রয়েছে পুরোপুরি।
এ প্রসঙ্গে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কামরান টি রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, দেশের শিল্প খাত ভয়াবহ জ্বালানি সংকটে পড়েছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, কোথাও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কারখানা চালানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগও জ্বালানি সংকটে আটকে আছে। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতার বিকল্প হলো দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো। এতে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
ঝুঁকিতে বিনিয়োগ: গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের খরা কাটাতে বর্তমান সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন। সম্প্রতি দেশে বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ২৫টি কোম্পানির প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই প্রতিনিধিদলও িনরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। চলতি সপ্তাহে ভারতের উচ্চপর্যায়ের আরও একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসছেন। কিন্তু এমন সময় সফর, যখন বিনিয়োগের নিয়ামক গ্যাস ও বিদ্যুতে সংকট চলমান।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ, দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং এলএনজি আমদানিও ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, গ্যাসনির্ভর নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।
ব্যাংকের জন্য নতুন বিপদ: বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন এমনিতেই উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপ সামলাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় শিল্পঋণ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিক্রি কমলে নগদ প্রবাহ কমবে। নগদ প্রবাহ কমলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি পরিশোধে চাপ তৈরি হবে।






