বই পড়াতে পাখি বাঁচাতে নিবেদিত নাহিদ

পাখির আশ্রয়ের জন্য গাছের ডালে কলস ঝুলিয়ে দেন নাহিদ উজ্জামান
বাবার মুরগির খামারে দিনরাত কাজ করেন মো. নাহিদ উজ্জামান (২৪)। সেখান থেকে পাওয়া হাতখরচের টাকা নিজের প্রয়োজন মেটাতে খুব সামান্যই খরচ করেন। বাকি টাকা জমিয়ে কেনেন বই, গাছের চারা ও মাটির কলস। সেই বই তুলে দেন অসচ্ছল শিক্ষার্থীর হাতে। গাছ লাগান রাস্তার পাশে। আর পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কলস ঝুলিয়ে দেন গাছের ডালে। পথচারীদের জন্য বিশ্রামের জায়গা, পানির ব্যবস্থাও করেন নাহিদ।
নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার জালমাছমারী এলাকার এই তরুণ। তিনি এই এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে।
নাহিদ বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের জন্য কিছু করার। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য কাজ করছি। বই, গাছ, পাখি কিংবা পথচারী— সবকিছুই আমাদের সমাজ ও পরিবেশের অংশ। যতদিন সামর্থ্য থাকবে, ততদিন নিজের মতো করে এসব কাজ করে যেতে চাই।’
নাহিদের এ পথচলার শুরু ২০১৪ সালে। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর ঝরে পড়া ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই দেওয়া শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বই বিতরণের পরিধি।
২০২০ সালে তিনি শিবগঞ্জের পিটালিতলা মোড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘শান্তি নিবিড় পাঠাগার’। বর্তমানে পাঠাগারটিতে বই রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫৯০টি। শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ তৈরি করা এবং বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। নাহিদ বললেন, ‘বাবার মুরগির খামারে দিনরাত পরিশ্রম করি। খামারের লাভের অংশ থেকে বাবা আমাকে প্রতি মাসে হাতখরচ দেন। নিজের জন্য খুব সামান্য খরচ করি। বাকি টাকা দিয়ে বই কিনি এবং বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় করি।’
বইয়ের পাশাপাশি নাহিদের ভাবনায় এসেছে প্রকৃতিও। রাস্তার পাশে গাছ লাগান, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দেন। পাঠকদের বইয়ের সঙ্গে গাছের চারাও উপহার দেন। তার দাবি, এ পর্যন্ত রোপণ করেছেন ও উপহার দিয়েছেন প্রায় ৮ হাজার গাছ।
গাছ আছে অথচ পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় থাকবে না— এটি মানতে পারেননি তিনি। তাই গাছের ডালে ডালে মাটির কলস ঝুলিয়ে দেওয়া শুরু করেন। ‘মন চাইলে গাছে হাঁড়ি’ নামে এই উদ্যোগে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০টি কলস ঝুলিয়েছেন তিনি।
পথচারীদের কথাও ভেবেছেন নাহিদ। উপজেলার পিটালিতলা ও পাইকরতলা মোড়ে মানুষের জন্য ঢালাই করে বসার জায়গা করে দিয়েছেন, স্থাপন করেছেন নলকূপ, যাতে পথচলতি মানুষেরা পানি পান করতে পারেন।
এসব কাজ করতে গিয়ে নিজের জীবনযাপনও সীমিত করেছেন নাহিদ। কানসাট সোলেমান ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। পড়াশোনা, খামারের কাজ ও সামাজিক কর্মকাণ্ড— সবই সামলে চলেছেন।
নিজের টাকায় কেনা বই যখন কোনো শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে যায়, লাগানো গাছ যখন বড় হয়ে ছায়া দেয়; কিংবা গাছের ডালে ঝোলানো কলসে কোনো পাখি আশ্রয় নেয়, তখনই নিজের শ্রমের সার্থকতা খুঁজে পান নাহিদ।






