লোহিত সাগর নিয়ে সৌদির প্রতিরক্ষা জোট কাজ করবে?

ছবি: রয়টার্স
লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় বহুজাতিক নৌ প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। বৃহস্পতিবার দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শহর জেদ্দায় জোটের তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে ১৫টি দেশ।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক্স অ্যাকাউন্টের এক পোস্টে জানিয়েছে, ‘যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা দেশের সংখ্যা ১৫-এ পৌঁছেছে। ১৩টি দেশ তাদের জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছে। এটি জোটের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপারেশনাল সক্রিয়করণের পর্যায়ে প্রকৃত উদ্বোধনকে নির্দেশ করে। বাকি দেশগুলো যোগদানের প্রয়োজনীয় জাতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে।’
উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জোট হিসেবে ঘোষণা করা জোটটিতে প্রথম পর্যায়ে যোগদানকারী দেশগুলো হলো — বাহরাইন, বাংলাদেশ, কোমোরোস, জিবুতি, মিশর, জর্ডান, কুয়েত, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, সুদান, তুরস্ক ও ইয়েমেন। রিয়াদ বলছে, জোটটির লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে একমত যেকোনো দেশ যোগ দিতে পারবে এবং নতুন সদস্যপদের আবেদনও অব্যাহত রয়েছে।
গত জুলাইয়ে প্রথমবারের মতো ‘বহুজাতিক নৌ প্রতিরক্ষা জোট’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সম্মিলিত নৌ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করায় ছিল এর লক্ষ্য।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, সদস্য দেশগুলো তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অপারেশনাল পরিকল্পনা তৈরি, যৌথ নৌ মহড়া ও ড্রিল পরিচালনা, সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং যৌথ নৌ অভিযান চালাবে। জোটের কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন রিয়ার অ্যাডমিরাল আব্দুল্লাহ বিন সালেম আল-শেহরি।
তিনি যৌথ নৌ প্রতিরক্ষা তদারকি, সদস্য দেশ ও অন্যান্য নৌ জোটের সঙ্গে সমন্বয় এবং জোটের সনদ অনুযায়ী মিশন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন।
এই জোট গঠনের ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে যখন মার্কিন-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যুদ্ধের মনোযোগ হরমুজ প্রণালীর দিকেও বাড়ছে।
এই প্রণালি দিয়ে আগে বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যেত। এর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে বাব আল-মানদেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগর রুটে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজগুলো ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের হাতে বারবার হামলার শিকার হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক আহমেদ নাগি আল জাজিরাকে বলেছেন, নতুন এই নৌ জোট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে তার প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় তার ওপর।
তার ভাষ্য, ‘এডেন উপসাগরে জলদস্যু সংকটের সময়ও কয়েকটি নৌ নিরাপত্তা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিছু উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকলেও অনেকগুলোই মূল লক্ষ্যকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। একই কথা এই জোটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জোটটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে যদি চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে নৌ নিরাপত্তা ও নৌচলাচলের স্বাধীনতার হুমকি মোকাবিলার বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করা যায়।’
নাগি আরও বলেছেন, জোটটি শুধু হুথিদের প্রতিরোধ করার নয়। লোহিত সাগরে জাহাজে হুথি হামলাকে শুধু সৌদি সমস্যা নয়, বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করার।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। এরপর থেকে তারা সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে।
মার্কিন-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়ার পর থেকে এই উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তেহরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি পতাকাবাহী জাহাজ ও তেল স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। এর ফলে হুথিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি সম্পূর্ণভাবে অবরোধ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নাগির বলেছেন, ‘রিয়াদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই হামলার জবাব শুধু সৌদি আরবের ওপর পড়া উচিত নয়। হুথি এবং লোহিত সাগরে তাদের সৃষ্ট বিঘ্ন মোকাবিলায় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা থাকা উচিত। এখন পর্যন্ত জোটটি মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।’
তবে এ সিনিয়র বিশ্লেষকের দাবি, ‘হামলা চলতে থাকলে সৌদিরা চুপ থাকবে না। কোনো এক পর্যায়ে রিয়াদ আরও সরাসরি জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সেক্ষেত্রে জোটটি সৌদি আরবকে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে কাজ করার কাঠামো দিতে পারে।’
আলজাজিরা থেকে অনূদিত






