অপরাধী ধরতে আসছে এআই
- রাজধানীর ৪ হাজার পয়েন্টে বসবে ১৫ হাজার সিসি ক্যামেরা
- পুলিশের অস্ত্র-পোশাক ও হ্যান্ডকাফে থাকবে জিপিএস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানী ঢাকায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আর যান চলাচলে নৈরাজ্য থামাতে ‘সেফ সিটি’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ট্রাফিক সিগন্যাল এবং মোড়ে মোড়ে বসানো হবে ১৫ হাজার সিসি ক্যামেরা ও ডিভাইস। এসব ক্যামেরা ও ডিভাইসে থাকবে গাড়ি শনাক্তকরণ এবং মানুষের মুখমণ্ডল চিহ্নিতকরণ প্রযুক্তি। উন্নত বিশ্বের স্মার্ট নগরীর মতোই অপরাধী বা আইন অমান্যকারীদের লাগাম পরাবে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের বহুজাতিক কোম্পানি। ওরাকল, সিসকোসহ অন্তত ১০টি কোম্পানি এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে দিয়েছে তাদের প্রেজেন্টেশনও। নিজস্ব অর্থায়নেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার আগ্রহ দেখিয়েছে কোনো কোনো কোম্পানি।
নিরাপদ শহর গড়ার এই প্রকল্পে উন্নতমানের সফটওয়্যারের মাধ্যমে সব ক্যামেরা ও ডিভাইসের সংযোগ থাকবে। এজন্য গড়ে তোলা হবে তথ্য ডেটাবেজ ও সেন্টার। সেখান থেকেই এআইর মাধ্যমে নজরদারি করা হবে প্রতিটি পয়েন্ট। অপরাধী কীভাবে কোন পথে পালাচ্ছে, তা মনিটরিং সেলের পর্দায় দেখতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা।
এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র, পোশাক, হ্যান্ডক্যাফেও জিপিএস, আইওটিসহ অত্যাধুনিক ডিভাইস লাগানো থাকবে। বাহিনীর কোনো সদস্য যাতে সরকারি অস্ত্র ও েপাশাক ব্যবহার করে অপকর্মে জড়াতে না পারেন, সেজন্যই থাকবে এ ব্যবস্থা।
উল্লিখিত বিষয়ের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল এক হাজার কোটি টাকা। পরে পূর্বাচলসহ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকা ডিএমপিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এর ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। অবশ্য চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি দেড় হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলেও জানালেন তিনি। তার তথ্যমতে, শুধু উন্নতমানের সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিভাইসে ব্যয় ধরা হয়েছে অন্তত ৯৯৬ কোটি টাকা।
ওই কর্মকর্তা নিজের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, কিছু বিদেশি কোম্পানি পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দিতে আগ্রহী। তারা টোল সিস্টেমে তাদের খরচ তুলে নেবে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও নিতে চায় তারা। এ বিষয়ে তারা নিজেদের প্রেজেন্টেশনও দেখিয়েছে। তবে এখনো হয়নি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
বর্তমানে রাজধানীর আটটি জায়গায় প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় এআই প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। স্পটগুলো হলো— বাংলামোটর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, মিন্টো রোড, কাকরাইল সার্কেল, মৎস্য ভবন, কদম ফোয়ারা, শিক্ষা ভবন ও শাহবাগ মোড়। আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় এই সিগন্যাল ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর ও সচল থাকায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের আগের মতো সার্বক্ষণিক দাঁড়িয়ে হাতে সংকেত বা সিগন্যাল দিতে হয় না। শিগগির ঢাকা মহানগরের আরও ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এ ধরনের আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পাইলট প্রকল্পের সুফল দেখেই অপরাধ ও যানজটে লাগাম পরাতে তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগাতে চায় সরকার।
খুন, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদক স্পট এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে ঢাকার অন্তত ৪ হাজার গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ট্রাফিক সিগন্যালে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিভাইস লাগানো হবে, যা চালু থাকবে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা। এসব ক্যামেরা ও ডিভাইস দেখভালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ট্রাফিক সিগন্যালের পাশে নির্মাণ করা হবে অত্যাধুনিক অপারেশনস রুম বা কেন্দ্র। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত আইটি এক্সপার্টরা ডেটা সেন্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করবেন উন্নতমানের অ্যাপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে। ফলে রাজধানীর যেকোনো প্রান্তে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে বা অপরাধ সংঘটিত হলে তার সার্বক্ষণিক ভিডিও ফুটেজ জমা হবে ডেটা সেন্টারে, যা দেখে শনাক্ত করা যাবে অপরাধী।
এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাইসহ যেকোনো ধরনের অপরাধ করে আর রাজধানীতে পালিয়ে থাকা যাবে না। প্রকল্পের মুখমণ্ডল চিহ্নিতকরণ যন্ত্রের সামনে যেকোনো অপরাধীর ছবি ধরা হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যাতায়াতের সব তথ্য মিলবে। প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারে সংযোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাড়তি তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
ট্রাফিক নিয়ম ভেঙে যান চলাচল করলে সেটাও তাৎক্ষণিকভাবে এআই চিহ্নিত করবে। অপরাধ অনুযায়ী যানবাহনের মালিকের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএমএস চলে যাবে। জরিমানা পরিশোধ না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট যানবাহন ক্যামেরার সামনে গেলেই সংকেত দেবে এআই। এ ছাড়া কোনো রাস্তায় বা মোড়ে একসঙ্গে ২০-২৫ জনের জটলা বা কোথাও ধোঁয়া কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু দেখলেই বিশেষ সংকেত দেবে এআই। কোনো ক্যামেরা নষ্ট বা অব হয়ে গেলেই জিআইএস পদ্ধতিতে তথ্য মিলবে ডেটা সেন্টারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশ সদর দপ্তর চায় এই প্রকল্পের অধীন থাকা ক্যামেরা ও ডেটা সেন্টারের একক সংযোগ থাকবে। যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ডিএমপির হাতে। যাতে ডেটা সেন্টারের তথ্য তৃতীয়পক্ষের হাতে না যায়। প্রকল্পের সার্ভার নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। তার ভাষ্য, বিদেশি কোম্পানিকে প্রকল্পের দায়িত্ব দিলে স্পর্শকাতর অনেক তথ্য তৃতীয়পক্ষের হাতে চলে যাবে। সেই ঝুঁকির কথাও বিবেচনা করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। অবশ্য প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বললেন, সবদিক যাচাই-বাছাইয়ের পরই নেওয়া হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।






