স্মরণে শ্রদ্ধায় শহীদ কাদরী
কবিতাই ছিলো যার দেশ, আশ্রয়

শহীদ কাদরী (১৪ আগস্ট ১৯৪২-- ২৮ আগস্ট, ২০১৬)
কবিকে সংগ্রাম করতেই হয়— আজীবন, নিঃশব্দে, নিজের ভেতরে, নিজেরই সঙ্গে— সেই সংগ্রাম থেকে জন্ম নেয় কবিতা। শহীদ কাদরী তেমনই এক কবি, যিনি খুব অল্প লিখেও বাংলা কবিতার মানচিত্রে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। সাতচল্লিশ-উত্তর কবিতাধারায় আধুনিক মনন ও জীবনবোধ সঞ্চারিত করে কবিতার রূপবদলে যাঁরা কারিগর, শহীদ কাদরী তাঁদের অন্যতম। তাঁর কবিতা আমাদের নিয়ে যায় সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতে— ঝলমলে বিশ্ব-নাগরিকতার বোধ আর গভীর স্বাদেশিকতার মিশেলে শব্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষার অভিনবত্বে তিনি যেন বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝলকে ঝলকে সত্য উদ্ভাসন করে পর মুহূর্তে মিলিয়ে যান দূর দিগন্তের নিভৃত নির্জনতার কোলে।
আল মাহমুদ লিখেছিলেন, শহীদ কাদরী তাঁর বন্ধু। ফোনে সেই গাঢ় স্বর, “আমি শহীদ”— আর হা হা হা হাসি। আসাদ চৌধুরীও তাঁকে হারিয়ে বলেছেন, “আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি।”
আল মাহমুদ লিখেছিলেন, শহীদ কাদরী তাঁর বন্ধু। ফোনে সেই গাঢ় স্বর, “আমি শহীদ”— আর হা হা হা হাসি। আসাদ চৌধুরীও তাঁকে হারিয়ে বলেছেন, “আমি আমার বন্ধুকে হারিয়েছি।” বন্ধুত্বের এই উষ্ণ স্মৃতির আড়ালে যে কবি দাঁড়িয়ে, তিনি নিঃসঙ্গ, আত্মনিমগ্ন, অথচ তাঁর কবিতা জুড়ে মানুষের জন্য এক অস্থির আকুলতা। শহীদ কাদরীর জীবনযাপনই ছিল ভিন্ন রকম— আধুনিক মানসিকতা, কাব্যভাষা, পশ্চিমা ভঙ্গিমার সঙ্গে বাংলাদেশের মাটি-জল-সংগ্রামের অপূর্ব মিশেল। ষাটের দশকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদদের পাশাপাশি তিনি তরুণ কবিদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭) বেরোবার পরই বোঝা গেল, এ কণ্ঠ অন্য সবার থেকে আলাদা। নগরজীবনের অসংগতি, ক্লেদ, হতাশা আর কামনার অন্ধকার তিনি এঁকেছেন তীক্ষ্ণ চিত্রকল্পে। “ঝুলে থাকে মাঝরাতে রেস্তরাঁর কড়িকাঠ থেকে—/ বাদুড় না বেলুন বন্ধু, স্বপ্ন না হতাশায় ঠাসা?”— এই পঙ্ক্তিতে যেনো ধরা পড়ে তাঁর নগরচেতনার রহস্যময়তা। “জন্মেই কুঁকড়ে গেছি মাতৃজরায়ুন থেকে নেমে/ সোনালি পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন/ দীপহীন ল্যাম্পপোস্টের নীচে, সন্ত্রস্ত শহরে”— এ যেন বোদলেয়ারের ছায়া, কিন্তু সম্পূর্ণ নিজের মাতৃগর্ভ থেকে নিয়ে আসা গন্ধ। ‘আলোকিত গণিকাবৃন্দ’ কবিতায় গণিকাবৃত্তির প্রতি দরদ মেশানো উপাসনা বাংলা কবিতায় বিরল।
শহীদ কাদরী শুধু নাগরিক কবি নন; তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের নিসর্গ, পশুপাখি, লোকজীবনের নানা প্রপঞ্চও জেগে ওঠে। ‘পরস্পরের দিকে’ কবিতায় জীবনানন্দীয় পরাবাস্তবতার আভাস থাকলেও বিষয়বস্তু তাঁর নিজের— “একটা মদির অশ্ব বারবার লাফিয়ে উঠছে/ বাতাসে শূন্যতায়,/ বাখানে ঝুলন্ত চাঁদ জবার মতো লাল।”
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লিখিত ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ (১৯৭৪) তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এখানে মাধুর্যেরর অধিক প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার দীপ্ত উচ্চারণ। স্বদেশভূমিকে প্রিয়তমা সম্বোধন করে কবি উচ্চারণ করেন এক নান্দনিক, সন্ত্রাসমুক্ত, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন: “ভয় নেই/ আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে/ শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন/ আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে/ গণচুম্বনের ভয়ে হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা।” এই কবিতায় কবির স্বপ্ন শুধু আবেগ নয়, সচেতন উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা— “একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী।” ‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন’ কবিতায় শিল্পচেতনাকেই মুক্তির প্রধান অবলম্বন করেছেন: “রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো/ জেনারেলদের হুকুম দেবেন রবীন্দ্রচর্চার? মন্ত্রীদের/ কিনে দেবেন সোনালি গীটার? ব্যাঙ্কারদের/ বানিয়ে দেবেন কবিতার নিপুণ সমঝদার?” আরও স্পষ্ট— “গীতবিতান ছাড়া কিছু রপ্তানি করা যাবে না বিদেশে।” ‘কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমার’ কবিতায় কবিতাকে ফিল্ডগানের মতো গর্জে ওঠার আহ্বান: “যদি পারো গর্জে ওঠো ফিল্ডগানের মতো অন্তত একবার…”। ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’, ‘নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে’, ‘ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়’— এসব কবিতায় যুদ্ধোত্তর সমাজবাস্তবতা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, উদ্বাস্তুর দুরবস্থা কবির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। ‘ব্ল্যাক আউটের পূর্ণিমায়’ তিনি লেখেন, “একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ/ আমার কনিষ্ঠ আঙ্গুলে কখনও উদ্ধত তলোয়ারের মতো” এবং শেষে, “ব্ল্যাক আউট অমান্য করে তুমি দিগন্তে জ্বেলে দিলে/ বিদ্রোহী পূর্ণিমা। আমি সেই পূর্ণিমার আলোয় দেখেছি:/ আমরা সবাই ফিরছি আবার নিজস্ব উঠোন পার হয়ে/ নিজেদের ঘরে।” স্বদেশের প্রতি এই মমতাই শহীদ কাদরীর কবিতার প্রাণভোমরা।
তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ (১৯৭৮) এসে পৌঁছায় এক পরিণত শিল্পসুষমায়। এখানে যুদ্ধ, স্বদেশ কিংবা নগরকেন্দ্রিক উদ্বেলতা তেমন তীক্ষ্ণ নয়, বরং পশুপাখির প্রতীকী উপস্থিতি চোখে পড়ে। ‘আজ সারাদিনে’ কবিতার শুরু: “আজ সারাদিন বাতাস, বৃষ্টি আর শালিক/ আমাকে ধাওয়া করে বেড়ালো” এবং তারপর “ঐ শালিকের ভেতর উনুনের আভা, মশলার ঘ্রাণ”— এই পঙ্ক্তিদুটি যেন কবিতার শরীরে রান্নাঘরের উষ্ম, মাটির গন্ধ ঢেলে দেয়। ‘সঙ্গতি’ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবজীবনের বৈপরীত্য এঁকেছেন অসামান্য দার্শনিক প্রত্যয়ে: “বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা/ মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,/ কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা/ ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ” — তারপরেই সেই মর্মবিদারক সত্য: “প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই/ কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…”। ‘একটি মরা শালিক’ কবিতায় পরাবাস্তব দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে মৃত্যুও যেন সঙ্গী হয়ে ওঠে। ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না’ কবিতায় ফুটপাতে শুয়ে থাকা নেংটো ভিখিরির নাভিমূলে “টলটল করছে শিশির/ এবং পাখির প্রস্রাব”— এ এক অসামান্য চিত্রকল্প, যেখানে করুণা ও সৌন্দর্য একাকার।
আব্দুল মান্নান সৈয়দ তাঁর ‘ঈশ্বরগুপ্ত থেকে শহীদ কাদরী’ গ্রন্থের শিরোনামেই বুঝিয়ে দিয়েছেন— শহীদ কাদরী দিয়ে একটি যুগ চিহ্নিত করা যায়। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদদের পর এ দেশের প্রধানতম কবিও এজন্যই তিনি। অল্প লেখার পরেও তাঁর কবিতা পাঠকপ্রিয়, আবৃত্তিতে প্রাণ পায়, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার আড়ালে রয়েছে গভীর শিল্পচেতনা। তিনি যেমন তিরিশি আধুনিকদের সার্থক উত্তরসূরি, তেমনি ইউরো-আমেরিকান আধুনিকতার মৌলিক গুঞ্জরণও তাঁর কবিতায় শোনা যায়। তবে তাঁর কবিতার মাটি এই বাংলা, এই বাংলাদেশের সংকট-সংগ্রাম-স্বপ্ন। বোদলেয়ারের ক্লেদ, ফরাসি প্রতীকবাদীদের আলো, ইউরোপের অন্ধকার— সবকিছু ছাপিয়ে তিনি উচ্চারণ করেন বাংলাদেশের মানুষের কথা। মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, শোষণ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা, ক্ষুধা— সব তাঁর কবিতার শরীরে ভর করে আছে। কিন্তু তিনি কোনো মতবাদের প্রচারক নন; তিনি শিল্পেরই পক্ষে, মানুষের পক্ষে। তাঁর বিশ্বাস, কবির কাছেই পৃথিবী নিরাপদ, কবিই আনতে পারেন নতুন দিন। সেই জন্যই তিনি লিখতে পারেন— “দ্রুত তিমিরে তলাবে/ গদ্যের বদলে যারা সুললিত পদ্যে সমর্পিত—”।
শহীদ কাদরী স্বেচ্ছানির্বাসনে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন সৃষ্টিশীলতার বিশেষ সন্ধিক্ষণে। কেন, তা আমরা পুরোপুরি জানি না। তবে জানি, তিনি নিজের উচ্চ মানদণ্ডের কাছে অন্যদের চেয়ে নিজেই বেশি কঠোর ছিলেন।
শহীদ কাদরী স্বেচ্ছানির্বাসনে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছিলেন সৃষ্টিশীলতার বিশেষ সন্ধিক্ষণে। কেন, তা আমরা পুরোপুরি জানি না। তবে জানি, তিনি নিজের উচ্চ মানদণ্ডের কাছে অন্যদের চেয়ে নিজেই বেশি কঠোর ছিলেন। অসংখ্য লেখা মাথায় এসেছে, কিন্তু লেখেননি— এই ভেবে যে সেগুলো অসামান্য নয়। এই দ্বিধাই আমাদের তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি পাওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। তাঁর ‘উত্তরাধিকার’ পাঠ করলে মনে হয়, নগরের ক্লেদ ও অন্ধকারের ভেতর দিয়ে হেঁটে গেছেন এক নিঃসঙ্গ পথিক, যাঁর হাতে লণ্ঠন নয়, শব্দের আগুন। ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ পাঠ করলে বুকের ভেতর দেশপ্রেমের স্রোত জেগে ওঠে, কিন্তু তা নিছক স্লোগান নয়— নান্দনিক প্রতিবাদ। ‘সঙ্গতি’ পাঠ করলে মনে হয়, জীবনের সব পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝে শান্তির অপ্রাপ্তিই চিরন্তন সত্য। “কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো” — কবির এই আর্তি শুধু অন্ধকারের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের চিরকালের শান্তিহীনতার বিরুদ্ধে। শহীদ কাদরীর কবিতা সেই আর্তিরই নান্দনিক উৎসারণ।
গ্যারি স্নাইডার বলেছিলেন, কবিতাকে গাইতে বা বলতে হবে প্রামাণ্য অভিজ্ঞতা থেকে। শহীদ কাদরীর কবিতা সেই প্রামাণ্য অভিজ্ঞতারই শিল্পিত রূপ। জীবনের জন্ম-মৃত্যু-প্রেম-যন্ত্রণা— সবই তাঁর কবিতায় সমসত্ত্বভাবে মিশেছে। তিনি তাঁর কবিতায় আমাদের সেই জগতে নিয়ে যান, যেখানে শালিকের ভেতর উনুনের আভা, মরা শালিকও সঙ্গী, রাষ্ট্রপ্রধানও কবিতার কাছে নত, আর প্রিয়তমার অভিবাদনে কাঁপে রণতরী। সেখানে দেশ আছে, আছে পৃথিবী; আছে নগরের অন্ধকার, আবার গ্রামের জন্য হাহাকারও। কবিতাই ছিল তাঁর একমাত্র স্বদেশ, একমাত্র আশ্রয়। শহীদ কাদরী আমাদের সেই কবি, যিনি বিদ্যুচ্চমকের এক ঝলকে সত্য দেখিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেলেন দিগন্তের নির্জনতায়— কিন্তু তাঁর কবিতার আলো জ্বলে থাকবে বাংলা কবিতার বিস্তীর্ণ উঠোনে, অনাগত কালের পাঠকের হৃদয়ে মনে মগজে কানে।











