গ্রামের লোডশেডিং এবার ঢাকায়
- ঢাকায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎবিভ্রাট ৫৪৭ মেগাওয়াট
- রান্না বন্ধ, বাড়ছে হোটেলনির্ভরতা
- খাবারের সঙ্গে বড় পরিবর্তন বাজেটে

প্রতীকী ছবি
লোডশেডিং— সে তো গ্রামে হয়, শহর মানে রাতেও আলো ঝলমলে। কিন্তু এই বাস্তবতায় এবার ছেদ পড়েছে। বিদ্যুৎবিভ্রাটের সঙ্গে ঢাকার মানুষের সম্পর্কটা এখন যেন ক্রমেই গ্রামের মানুষের মতো হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কয়েক দিন ধরে রাজধানীর অলিগলি থেকে অভিজাত এলাকায় চলছে বিদ্যুতের লুকোচুরি। গ্রামের মানুষ যে ভোগান্তিকে বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন, এবার সেই অভিজ্ঞতাই কড়া নাড়ছে রাজধানীবাসীর দরজায়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, বাসাবাড়ির কাজ কিংবা অনলাইননির্ভর কার্যক্রম; লোডশেডিংয়ের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনোটিই।
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড-আরইবি। দেশ জুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে এই শক্তি বিতরণ করে সংস্থাটি। বর্তমানে দেশের ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই আরইবির। অথচ আজকাল গ্রামাঞ্চলে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিংয়ের কারণে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা থাকছে না বিদ্যুৎ। তবে এতদিন এই চিত্র শুধু গ্রামেই ছিল। এবার এই খাতায় নাম উঠেছে ঢাকারও।
সারা দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয় ৯টি জোনের আওতায়। জোনগুলোর তথ্য বলছে, গত চার দিনের মধ্যে দুদিনই লোডশেডিংয়ে শীর্ষে ছিল রাজধানী। ৯ আগস্ট ঢাকা জোনে ঘাটতি ছিল ৫৪৭ মেগাওয়াট, যা ৯টি জোনের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরদিন ১০ আগস্ট ঢাকায় লোডশেডিং করা হয় ৩৬৪ মেগাওয়াট।
গত মঙ্গলবারও ঢাকা জোনে বিদ্যুতের সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়। জোনটিতে ওইদিন বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট, আর ঘাটতি ছিল ৫৮৫ মেগাওয়াট। পরদিন ১২ আগস্ট ঢাকা জোনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৪৪৫ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ ছিল ময়মনসিংহে ৫৭৫ মেগাওয়াট। ঢাকা জোনে এমন বিদ্যুৎবিভ্রাটের প্রবণতা এখন ভাবিয়ে তুলছে রাজধানীবাসীকে।
রান্নার ভোগান্তি: সকালে ঘুম থেকে উঠে আজকাল আর গ্যাসের চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেন না মিরপুরের বাসিন্দা শাওন আহমেদ। মাসের পর মাস গ্যাসের চাপ না থাকায় মাস ছয়েক আগে তিনি কিনেছিলেন একটি ইলেকট্রিক চুলা। মনে হয়েছিল, রান্নার সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, কিন্তু না। দু-তিন দিন ধরে রান্নাঘরে সেই বৈদ্যুতিক চুলাটিও পড়ে আছে নিষ্কর্মা। কারণ, গ্যাসসংকটের পর এবার রাজধানীতে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। দুদিন থেকে হোটেলের খাবারেই চলছে শাওনের। তিনি বললেন, গ্যাস থাকে না, তাই বিদ্যুতের চুলা কিনলাম। এখন তো বিদ্যুৎও থাকে না।
আবার রামপুরার বাগিচারটেক এলাকায় স্বামী আর চার সন্তান নিয়ে বাস গৃহকর্মী পারুলের। গত পরশু বাগিচারটেকে গ্যাস আসে মধ্যরাতে। তখন পরিবারের জন্য রান্না করেন পারুল। গতকাল দিনভর গ্যাসের সংকটে হয়নি রান্না। তার ওপর নতুন করে শুরু হয়েছে বিদ্যুতের সংকট। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘টিনের ঘর, কারেন্টের জ্বালায় গরমে রাইতে ঘুমাইতে পারি নাই। আবার গ্যাসের জ্বালায় রান্না করতে পারি নাই, কয়ডা ভাত খাইছি যে বাসায় কাজ করি সেখানে।’
পারুলের পরিবার গতকাল খাবার খেয়েছে হোটেল থেকে এনে। জানালেন, এমন করে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে গেলে তার একবেলার খাবারের পেছনেই খরচ চারশ টাকার বেশি। এটি এখন শুধু শাওন বা পারুলের পরিবারের গল্প নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অনেক পরিবারেই তৈরি হয়েছে এমন সংকট। গ্যাসের সমস্যা মানুষকে যে বিকল্পের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, এখন সেই বিকল্পকেও বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে বিদ্যুতের সংকট।
দীর্ঘসময় ধরে গ্যাসের অনিশ্চয়তার কারণে এরই মধ্যে নগরবাসীর কেউ কিনেছেন এলপিজি সিলিন্ডার, আবার কেউ কিনেছেন ইন্ডাকশন কুকার কিংবা সাধারণ ইলেকট্রিক চুলা। অর্থাৎ নগরবাসী নিজের খরচে গ্যাসের বিকল্প তৈরি করে নিয়েছিলেন। আর সেই বিকল্পের ভিত্তি ছিল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে গত দুদিনের চরম লোডশেডিং এখন নগরবাসীকে ভাবাচ্ছে— এরপর বিকল্প কী?
বাড়ছে হোটেলনির্ভরতা: হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু বৈদ্যুতিক চুলাই নয়, থেমে যাচ্ছে ফ্রিজ, পানির পাম্প, ফ্যান সবকিছু। ফলে সংকট বহুমুখী। আর এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছে রাজধানীর কর্মজীবী পরিবারগুলো। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন যেসব পরিবারে, তাদের হাতে রান্নার জন্য বাড়তি সময় থাকে না। সকালে বিদ্যুৎ না থাকলে অফিসে যাওয়ার আগে তাদের জন্য রান্না করা কঠিন।
আবার বিদ্যুৎ না থাকলে রাতে ফিরেও থাকে না রান্নার সুযোগ। ফলে এসব পরিবারে বিকল্প হয়ে উঠছে হোটেল। ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস, খিচুড়ি কিংবা বিরিয়ানিতেই ভরসা। এতে শুধু খাবারের ধরনই বদলাচ্ছে না, বরং বদলে যাচ্ছে পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটও। এই অতিরিক্ত ব্যয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মহানগর এলাকার এক হোটেল ব্যবসায়ী বললেন, তাদের নিয়মিত কিছু ক্রেতা থাকলেও এখন অনেক নতুন মুখ আসছে খাবার কিনতে। যাদের অনেকেই এসে বলেন বাসায় কারেন্ট নেই, তাই বাইরে থেকে খাবার নিতে হচ্ছে।
এদিকে, বিদ্যুৎ না থাকলে কষ্ট শুধু রান্নাঘরেই হয়, এমনটা নয়। লোডশেডিংয়ে ফ্যান ও এসি বন্ধ হয়ে যায়। চলে না পানির পাম্পও। এ কারণে অনেক বাড়িতে ট্যাংকিতে পানি তোলার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার লিফট বন্ধ হয়ে বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের ভোগান্তিও চরমে। পাশাপাশি যেসব পরিবারে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ সদস্য রয়েছে, সেসব পরিবারের ভোগান্তি সীমাহীন।








