ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক
জট খুলছে না পাকাচ্ছে

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে একই সময়ে দুই ধরনের চিত্র তৈরি হয়েছে। একদিকে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রত্যর্পণ নিয়ে মতবিরোধ, দিল্লি থেকে তার রাজনৈতিক বক্তব্যে সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার সংকট। ফলে সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাকে সরলভাবে ‘উন্নতি’ বা ‘অবনতি’— কোনোটিই বলা যাচ্ছে না। বরং বলা যায়, ঢাকা ও দিল্লি একই সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত এবং নিজেদের স্বার্থ ও অবস্থান স্পষ্ট করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে ঢাকা-দিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বড় ধরনের ধাক্কা খায়। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সেই দূরত্ব আরও বাড়ে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার প্রত্যর্পণ দাবি, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্যসহ নানা অমীমাংসিত ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্কে সৃষ্টি হয় আস্থার সংকট। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই জমাট সম্পর্কের বরফ গলানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। আবার চালু হয়েছে ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম, বেড়েছে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী একের পর এক বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তার দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং ঢাকার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ঘটনাও নতুন কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু একই সময়ে দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ঢাকা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের জট কি সত্যিই খুলতে শুরু করেছে, নাকি একদিকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চললেও, অন্যদিকে নতুন নতুন টানাপড়েনে সেই জট আরও পাকিয়ে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সামনে রাখতে হবে। ভারতের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ; বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল ও কার্যকর সম্পর্ক প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্পর্ক কোনো দেশের রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে— পারস্পরিক সম্মান, সমতা, স্বচ্ছতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জনগণের স্বার্থ।
একদিকে যোগাযোগ, অন্যদিকে অস্বস্তি: বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান শুরু থেকেই ছিল— সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হবে পারস্পরিক স্বার্থ, সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। এ অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর এত দ্রুত তার দিল্লি যাওয়া এবং মোদির সঙ্গে বৈঠককে কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ ঢাকার বার্তা দিল্লিতে পৌঁছেছে, আবার দিল্লির অবস্থানও ঢাকার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক তৎপরতা নিছক নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদীর দিল্লি সফর এবং মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ সেই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় পাওয়া বার্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
ভারতের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক হলে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে। দীনেশ ত্রিবেদী এর আগে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হলে দুই দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে অগ্রগতি হতে পারে। এখানেই সম্পর্কের সম্ভাবনার জায়গাটি সবচেয়ে স্পষ্ট।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর। ভারত সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনারও বলেছেন, নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত যদি সফরটি হয় এবং তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠক হয়, তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বড় একটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনার পর্যায়ের আলোচনা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, রাজনৈতিক অস্বস্তি কাটাতে দুই দেশের সরকারপ্রধানের সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগের বিকল্প নেই। তবে এই সফর হবে কি না এবং হলে আলোচনার অগ্রাধিকার কী হবে— তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
শেখ হাসিনা ইস্যুতে জট কাটেনি: সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে আছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে অবস্থান নেওয়া শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। ভারতীয় পক্ষ বলছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে এবং বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। এমনকি ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। ঢাকার অভিযোগ, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগ দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কিন্তু কূটনৈতিক বাস্তবতা হলো, ভারত সরকার সরাসরি অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আর এ কারণেই শেখ হাসিনার ইস্যু এখনো দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।
আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের মতে, বৃহৎ দেশ হিসেবে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের দায়িত্ব বেশি। তার মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ভারতকে প্রভাবশালী প্রতিবেশীর অবস্থান থেকে বের হয়ে সমমর্যাদার প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে হবে। বাংলাদেশের আস্থা অর্জনের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদের মতে, ‘ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে মোড় নেওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, নতুন ভারতীয় হাইকমিশনারের সক্রিয়তা, ভিসা কার্যক্রম চালু এবং বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে তার ধারাবাহিক যোগাযোগ ইতিবাচক।’ তার মতে, দুই দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ বাড়লে রাজনৈতিক সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।




