চা বাগান কি মঙ্গলগ্রহে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চার দফা দাবিতে আবারও আন্দোলন চলছে চা বাগানে। দাবিগুলো নিতান্তই সাধারণ। দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড প্রণীত ২০২৩ সালের গেজেট বাতিল, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বি-৭৭) নির্বাচন এবং চা বাগানিদের ভূমির বন্দোবস্ত। এমনকি দাবিগুলো নতুন নয়। এর পেছনে কোনো ডিপস্টেট বা মহাশূন্যের এলিয়েনদের কারসাজিও নেই। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল বা নাগরিক তৎপরতা— কেউ চা বাগানের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। অথচ সবার হাতে হাতে পেয়ালাভর্তি গরম চা। চা বাগান যেন এক অচিন মঙ্গলগ্রহ।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে চা শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিবিষয়ক আলোচনায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মজুরি নিয়ে আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। চা শ্রমিকদের মজুরির প্রসঙ্গ এলেই মালিকপক্ষ শ্রম আইনবিরোধী এক বানোয়াট ফর্দ হাজির করে। আবাসন, চিকিৎসা, রেশন ও অবসর ভাতার সুবিধাকে তারা এমনভাবে প্রচার করে, যেন মনে হয় রুগ্ণ ভঙ্গুর চা শ্রমিকরা একেকজন ইলন মাস্ক বা মুকেশ আম্বানির চেয়েও ধনী। শ্রম আইনে বলা হয়েছে, বাসস্থান, পানি, আলো, চিকিৎসা সুবিধা, অবসর ভাতা ও ভবিষ্যৎ তহবিলে মালিক কর্তৃক প্রদত্ত অর্থ মজুরির অন্তর্ভুক্ত হবে না। শ্রম আইনের ৯৬ ধারার নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ অবস্থানগত কারণে মালিকপক্ষই চা শ্রমিকদের বাসস্থান নিশ্চিত করবে, এটি মজুরির অংশ নয়।
তরতর করে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের এক উন্নতি সূচক দেখানো হয় মাথাপিছু আয়। কিন্তু এই মাথাপিছু আয় কার? দেশের ১৬৭টি চা বাগানের লক্ষাধিক স্থায়ী শ্রমিক বা প্রায় ১০ লাখ বাগানিয়া মানুষের আয়? ২০০৬ সালে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৩০ টাকা আর বর্তমানে ১৮৭ টাকা। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ, সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন— সবার বিস্ময় এই টাকা দিয়ে কীভাবে সংসার চলে? এই আয় নিয়ে চা শ্রমিকরা উন্নয়নের পরিভাষায় নিতান্ত ‘গরিব’ ও ‘প্রান্তিক’। তার মানে, রাষ্ট্র চা বাগানের ১০ লাখ মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে পারেনি। ১৮ কোটির দেশে ১০ লাখ মানুষ কি তাহলে পিছিয়ে আছে? নাকি পিছিয়ে রাখা হয়েছে? এই মেহনতি মানুষগুলোই প্রতিদিন তাদের রক্তজলের লিকারে চাঙ্গা রাখছেন ক্লান্ত স্বদেশ।
দাবিগুলো নতুন নয়। এর পেছনে কোনো ডিপস্টেট বা মহাশূন্যের এলিয়েনদের কারসাজিও নেই। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল বা নাগরিক তৎপরতা— কেউ চা বাগানের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। অথচ সবার হাতে হাতে পেয়ালাভর্তি গরম চা। চা বাগান যেন এক অচিন মঙ্গলগ্রহ
এমনকি বর্তমানের এই বৈষম্যমূলক ১৮৭ টাকা মজুরিও এমনি এমনি হয়নি। এর জন্য অবিরত লড়াই সংগ্রাম করে মরতে হয়েছে। ১৯৬২ সালের ‘দ্য টি প্লান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স’ এবং ১৯৭৭ সালের ‘দ্য টি প্লান্টেশন লেবার রুলস’ দ্বারা চা শ্রমিকদের কল্যাণ নিয়ন্ত্রিত হতো। পরে ২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনে চা বাগানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালে একজন চা শ্রমিকের মজুরি ছিল দৈনিক ৩২ টাকা। ২০০৯ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করে ৪৫ এবং সর্বোচ্চ ৪৮ টাকা। আমাদের কি ২০২০ সালের চা বাগানের আন্দোলনের কথা মনে আছে? তখন দৈনিক মজুরি ছিল ১০২ টাকা, সেটি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা মজুরির জন্য আন্দোলনে নামেন চা শ্রমিকরা। আন্দোলনের পর মজুরি ১২০ টাকা করা হয়।
আগে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হতো শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশি চা সংসদের ভেতর সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে। সর্বশেষ চুক্তিপত্রটি কার্যকর হয় ২০০৫ সালে এবং ২০০৭ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও দেশে জরুরি অবস্থার কারণে তখন চুক্তি হয়নি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন করে চা শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করার কথা থাকলেও ১১ বছর পর করোনা মহামারীর সময় ২০২১ সালের ১৩ জুন চা শ্রমিকদের জন্য অন্যায্য মজুরি কাঠামো গেজেট আকারে প্রস্তাব করেছিল মজুরি বোর্ড। বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার কেজি বা তার চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে— এমন বাগান ‘এ’ শ্রেণি এবং ১ লাখ ৮ হাজার কেজির কম উৎপাদন করে চা বাগানগুলো ‘সি’ শ্রেণির। ‘এ’ শ্রেণির বাগানের স্থায়ী এবং সাময়িক/ক্যাজুয়াল শ্রমিকের জন্য দৈনিক ১২০, ‘বি’ শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৮ এবং ‘সি’ শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৭ টাকা প্রস্তাব ছিল সেই অন্যায় গেজেটে।
২০২২ সালে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আবারও শতাধিক বাগানের লাখো চা শ্রমিক ধর্মঘট করেছিলেন। ৯ থেকে ২৭ আগস্ট আন্দোলন ছিল তুঙ্গে। ২৭ আগস্ট ২০২২ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মালিকপক্ষের বৈঠকে ১২০ থেকে মজুরি ১৭০ টাকা করা হয়। পরে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বেড়ে বর্তমানে হয়েছে ১৮৭ টাকা।
‘টি গার্ডেন শিল্প সেক্টরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য নিম্নতম মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ’ বিষয়ক গেজেটের (১০/৮/২৩) তফসিল-খ (দৈনিক মজুরি) এবং তফসিল-ঙ, বিশেষ শর্ত ৭ এবং ৮ অনুযায়ী প্রতি বছর মজুরি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে (ইনক্রিমেন্ট)। ১৭০ টাকা মজুরির ৫ শতাংশ প্রথম বছরে ৮.৫০ এবং পরের বছর প্রায় ৮.৯২ টাকা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান আন্দোলনের একটি দাবি এই অন্যায্য গেজেট বাতিল করা।
এ ছাড়া শ্রমিকরা আবারও চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। সর্বশেষ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে। ২০২১ কিংবা ২০২৪ সালে নির্বাচন হয়নি। এর ফলে শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব, নতুন নেতৃত্ব এবং শ্রমিকের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রমিকরা তাদের ভূমি অধিকার প্রশ্নে কাঠামোগত দাবি তুলেছেন। দুইশ বছর ধরে চা বাগানে বসবাস করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখলেও চা শ্রমিকরা কার্যত ভূমিহীন। বাগান থেকে পরিবারভিত্তিক এক টুকরো বসতভিটা ও চাষাবাদের জন্য ‘ক্ষেতল্যান্ড’ জমি দেওয়া হলেও এর মালিকানা চা শ্রমিকদের নয়।
এ ছাড়া চা বাগানে বকেয়া মজুরি ও রেশনের জন্য আন্দোলন এক নিয়মিত ঘটনা। মে মাসেই হবিগঞ্জের দেউন্দি, মৃত্তিঙ্গা ও নোয়াপাড়া বাগানে বকেয়া মজুরি, রেশন, উৎসব ভাতা ও অন্যান্য পাওনার দাবিতে চা শ্রমিকরা কর্মবিরতি করেছিলেন। বাংলাদেশ শ্রম আইনের (২০০৬) ১৩৯ ধারা অনুযায়ী কোনো শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ প্রয়োজন হলে সরকার মজুরি বোর্ডকে তদন্তসাপেক্ষে ন্যূনতম মজুরি সুপারিশের নির্দেশ দিতে পারে।
চা শ্রমিকদের দাবিগুলো মেনে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকার নিশ্চয়ই এক্ষেত্রে বিগত রেজিমগুলোর কার্বন কপি হবে না। চা বাগানের ওপর জারি থাকা নয়াউদাবাদী ব্যবস্থার বর্ণবাদ ও উপনিবেশ কোন পর্যায়ের, তা বোঝার জন্য করোনা মহামারীর উদাহরণই যথেষ্ট। মহামারীতে দেশ-দুনিয়া লকডাউন হলেও স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে বাগান খোলা রেখেছিল রাষ্ট্র। চা শ্রমিকরা ২৬ মার্চ ২০২০ তারিখে বাগান মালিকদের চিঠি দিয়ে কিছুদিনের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটির দাবি জানিয়েছিলেন। নির্দয় মালিকরা চা শ্রমিকদের কথা রাখেননি। হবিগঞ্জের চণ্ডীছড়া চা বাগানে এক শিশু মারা যায় এবং পরীক্ষায় তার করোনা পজিটিভ আসে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা বাগানের মন্টু তাঁতির করোনা শনাক্ত হয় ২১ এপ্রিল ২০২১। অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বাগান কর্তৃপক্ষের কাছে একটা অ্যাম্বুলেন্স চেয়েছিলেন শ্রমিকরা। কর্তৃপক্ষ দেয়নি। পরে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে এনে তাকে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মন্টু তাঁতি করোনায় মারা যান।
সরকারের জানা আছে, চা বাগানগুলো মঙ্গলগ্রহে নয়। চা বাগানের ভোটেই নির্বাচিত হয় সরকার। আশা করি, সরকার চা শ্রমিকদের আন্দোলনে শামিল হবেন। শ্রমিকদের ঘরে যাবেন। তাদের পরিবারের সঙ্গে আলাপ করবেন। চা বাগান এলাকার শ্রমিক, মালিক, শ্রমিক সংগঠন, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, চা ব্যবসায়ী এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বসবেন। চা বাগানের করুণ বঞ্চনার গল্পগুলো সরকারকে নিজেই পরখ করতে হবে। দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকাসহ সাম্প্রতিক আন্দোলনের দাবি পূরণই রাষ্ট্রের একমাত্র কাজ নয়। ভয়, বঞ্চনা, উপনিবেশ ও বর্ণবাদের বন্দিদশা চুরমার করে চা বাগানের জীবনে ন্যায্য ও মর্যাদার চেহারা প্রতিষ্ঠাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
লেখক: গবেষক ও লেখক





