লোডশেডিং সামলাতে শিল্পের গ্যাস বিদ্যুতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে সরকার। সেই গ্যাস যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। সরকারের এই পদক্ষেপ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও অসন্তুষ্ট শিল্পোদ্যোক্তারা। তাদের শঙ্কা, গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হলে আরও সংকটে পড়তে পারে দেশের অর্থনীতি।
গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটছে। সংকট সামলাতে ব্যয়বহুল ডিজেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে সরকারের ওপর বাড়ছে নানামুখী চাপ।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লোডশেডিং সামাল দিতে সরকার এখন বিদ্যুতে গ্যাসের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। গত মঙ্গলবার থেকেই শুরু হয়েছে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে আমদানি হওয়া এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ২১০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদ্যুতে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট ও সারে ১৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি গ্যাস দেওয়া হচ্ছে কারখানা, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে। গত ২১ জুলাই একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্ধ হওয়ার পর বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ ১০০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৬৮ কোটিতে নেমে আসে। চলতি সপ্তাহের মাঝামাঝি সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়ে ৮০ কোটি ঘনফুটে নেওয়া হয়। আর টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে বিদ্যুৎ ও সার বাদে অন্যান্য খাতে প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এখন তা ১০০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। এতে শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি, সিএনজি স্টেশন সব খাতে ভয়াবহ গ্যাসসংকট শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকেই সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। শিল্পোৎপাদনেও নেমেছে ধস। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন ১০ আগস্ট থেকে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হবে, কিন্তু তা হয়নি; উল্টো গ্যাস সরবরাহ শূন্য হয়ে গেছে। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে ক্রেতা হারাচ্ছি। উৎপাদন না করেও কর্মীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে, ব্যাংকে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়বে।’
শিল্প বন্ধ করে সেই গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালে তা দিয়ে কী হবে— সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি: গতকাল বুধবার বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩৩৮২ মেগাওয়াট। আগের দিন ছিল ৩৫৯২ মেগাওয়াট। এর আগে অবশ্য লোডশেডিং ৩৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় লোডশেডিং কমে দাঁড়ায় ১৩১৯ মেগাওয়াটে। তখন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৩৯ মেগাওয়াট। আগের দিন একই সময়ে চাহিদা ও লোডশেডিং ছিল যথাক্রমে ১৬ হাজার ৬৭ মেগাওয়াট এবং ২৪৯৯ মেগাওয়াট। অথচ আগের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ কমেছে দুদিন ধরে। এরপরও হঠাৎ লোডশেডিং কমে যাওয়ার কারণ কী? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি চাহিদাও কিছুটা কমেছে।
এদিকে, গ্যাস ও কয়লাসংকটে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মূলত সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চালু রাখা হয়। গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস ওয়েলের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল এই বিদ্যুৎ। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ৩১ থেকে ৩২ টাকার মতো। এতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ২৪ টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
চলমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য গ্যাসের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বললেন, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান সংকটের ভিত্তি আগের সরকারের সময় থেকেই তৈরি হয়েছিল। ভুল নীতি গ্রহণ করলে একটা সময় তার মাশুল দিতে হবে। যেকোনো সময় এই সংকটের মুখোমুখি হতে হতো দেশকে।
ভোগান্তির জন্য মানুষের কাছে ফের ক্ষমা চেয়ে গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বললেন, বঙ্গোপসাগরের বৈরী পরিস্থিতির কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন এলএনজি খালাস করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, দুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালও এখনো পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। দেশি গ্যাসের উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়।
নিরাপত্তাহীনতায় বিদ্যুৎকর্মীরা: লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দেশের বিদ্যুৎকর্মীরা। গত ১০ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাবস্টেশনে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। পরদিন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। গত ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। একইদিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও বেশি বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ও স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে গতকাল পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।
ফের কমেছে গ্যাস সরবরাহ: গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস নিয়ে ভোগান্তি বেড়ে যায়। ১৫ দিন পর আংশিক চালুর পর গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী একটি কার্গো সামিট পরিচালিত টার্মিনালে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ কমেছে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে ৪১ কোটি ঘনফুটের মতো। টার্মিনাল দুটির সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। আগামী ১৫ আগস্ট নতুন কার্গো যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সামিটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসেও বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে বড় কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এই মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি করা খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে,’ যোগ করেন তিনি।
সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বললেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমদানি করা এলএনজি দিয়ে সমাধান হবে না। দেশের অভ্যন্তরে সিরিয়াসলি গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক জোর দেওয়া খুবই জরুরি।’
দোকানপাট বন্ধের নতুন নির্দেশনা: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে দেশের সব শপিং মল, মার্কেট ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। গতকাল রাতে বিদ্যুৎ বিভাগ এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকবে। তবে খাবার, ওষুধের দোকান ইত্যাদি এর বাইরে থাকবে। এ ছাড়া সব আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধের পাশাপাশি বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে শেষ করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।




