ডিয়ার ফিদেল : মাই লাইফ, মাই লাভ, মাই বিট্রেয়াল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বলিভিয়ার সিয়েরামাস্ত্রা পাহাড়ের হতভম্ব কোনো স্কুল বাড়িতে চে গুয়েভারার মতো গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে তার প্রাণহীন শরীর পড়ে ছিল না। তাকে হত্যা করার জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক বিরোধী শক্তির ৬৩৮টি প্রচেষ্টার ছক ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পৃথিবী জুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন। তার নাম ফিদেল কাস্ত্রো। গালে এলোমেলো দাড়ি, জলপাই সবুজ সেনা-পোশাক, ঝকঝকে দৃষ্টির মাঝে বিপ্লবের স্বপ্ন আর দাঁতে কামড়ে ধরা হাভানা চুরুট মানুষটিকে বিগত শতাব্দীর তিন দশক ধরে তরুণদের কাছে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক আকাশছোঁয়া আইকনে পরিণত করেছিল।
বন্দুক হাতে কিউবার মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন, গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত করেছেন, কিউবা বিপ্লবের সাফল্যের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে এক দল বিশিষ্ট কিউবার শাসন ক্ষমতার অধিশ্বর ছিলেন তিনি।
১৯২৬ সালের ১৩ অগাস্ট জন্মগ্রহণ করেন ফিদেল আলেহান্দ্রো কাস্ত্রো রুৎজের। ২০২৬ সালের এই আগস্টে পালিত হচ্ছে তার জন্মশতবার্ষিকী।
কাস্ত্রোর প্রেমে পড়েছিলেন তাকেই খুন করতে আসা সুন্দরী নারী মারিতা লোরেঞ্জ। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইকে এই মারিতাকে ব্যবহার করেই হত্যা করতে চেয়েছিল কাস্ত্রোকে। কিন্তু প্রেম আর মৃত্যু পরোয়ানার মাঝে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভালোবাসা।
‘ডিয়ার ফিদেল: মাই লাইফ, মাই লাভ, মাই বিট্রেয়াল’ নামে ১৯৯৩ সালে মারিতা লোরেঞ্জের লেখা একটি বই প্রকাশিত হয়। ফিদেল কাস্ত্রোকে লেখা একটি দীর্ঘ চিঠিই সেই বইয়ের বিষয়। বইতে মারিতা পৃথিবীর এই বিপ্লবী প্রবাদ পুরুষের জন্য তার প্রেম, তার ষড়যন্ত্রের কথা লিখেছেন।
১৯৫৯ সালে কিউবার বন্দরে এসে ভেড়ে ‘বার্লিন-৪’ নামে একটি বিলাসবহুল জাহাজ। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন হাইনরিখ লোরেঞ্জের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার কন্যা মারিতা। জাহাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন কিউবার ভাগ্য বিধাতা ফিদেল কাস্ত্রো। সঙ্গে কমরেড চে গুয়েভারা ও আরো কয়েকজন। সেই জাহাজে মারিতাকে দেখে আকর্ষিত হয়েছিলেন কাস্ত্রো।
মারিতার সঙ্গে কাস্ত্রোর পরিচয় এবং ঘনিষ্টতার পুরো বিষয়টাই ছিল আকস্মিক। ক্যাপ্টেন হাইনরিখ লোরেঞ্জ ঘুমিয়ে থাকায় কন্যাই কাস্ত্রোকে জাহাজ ঘুরিয়ে দেখান সেদিন। আর সেই অবসরেই একটু একটু করে ডানা মেলেছিল ভালোবাসার প্রজাপতি। মারিতার বসবাস তখন আমেরিকার নিউ ইয়র্কে।
মারিতা বইয়ে লিখেছেন, হাভানা থেকে ফোন আসত তাদের বাড়িতে। তিনি নিজেও কয়েকবার হাভানায় গিয়ে দেখা করেছিলেন কাস্ত্রোর সঙ্গে। ডালপালা মেলেছিল তাদের প্রেম। কিন্তু সংকটের বিষ তছনছ করে দিয়েছিল তাদের সম্পর্ক।
চা বাগান কি মঙ্গলগ্রহে
১৩ আগস্ট ২০২৬
মারিতার দাবি অনুযায়ী, তিনি গর্ভবতী হয়েছিলেন। পরে হাভানায় সেই অনাগত সন্তানকে গর্ভপাতের মাধ্যমে বিদায় জানাতে হয় তাকে। আর তখনই ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধ। মারিতা হাত মেলান আমেরিকায় কাস্ত্রো সরকারের বিরোধীদের সঙ্গে। সুযোগটা কাজে লাগায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা। তারা মারিতাকে দিয়েই ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা করার ছক তৈরি করে। হাভানার রানওয়ে স্পর্শ করে মারিতার প্লেন। তার সঙ্গে বিষ ভর্তি ক্যাপসুল। খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারলেই আমেরিকার পথের কাঁটা দূর হয়ে যাবে। কিন্তু প্লেন থেকে নেমেই মারিতা বুঝে ফেলেছিলেন কাজটি তিনি করতে পারবেন না। ফিদেল তার সত্যিকারের ভালোবাসা।
ফিদেল জানতেন মারিতা দেখা করতে আসছে। তারা সাক্ষাৎ করেছিলেন হিলটন হোটেলের ২৪০৮ নম্বর কক্ষে। কাস্ত্রো সম্ভবত বিপদ আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই সরাসরি মারিতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কি আমাকে হত্যা করতে এসেছ?’
বইতে মারিতা লিখেছেন, ভালোবাসার ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। সব স্বীকার করে তিনি আবার ফিরে গিয়েছিলেন নিউ ইয়র্কে। সেদিন ফিদেলের তার প্রতি শেষ সংলাপ ছিল— আমাকে কেউ হত্যা করতে পারবে না।








