সবকিছুর আগে জাতি নির্মাণ করা জরুরি

শংকর সাঁওজাল (জন্ম: ২ জুন, ১৯৫২)
অভিনেতা, নির্দেশক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক শংকর সাঁওজাল। তার কর্মজীবন জেনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন সাজ্জাদ হোসেন
আপনি তো উদীচীতে ছিলেন। ওখানে আপনার কাজ কী ছিল?
তরুণ বয়সে উদীচীতে কাজ করেছি বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বরিশাল, মঠবাড়িয়া, বরগুনা, পাথরঘাটা, মাছুয়া, শরণখোলা, পিরোজপুর— এসব জায়গায় উদীচীর হোলটাইমার হয়ে গিয়েছিলাম। শাখাগুলো তৈরি করেছি। সবাই ছিলেন, নেতৃত্বটি ছিল আমার। তখন নাওয়া নাই, খাওয়া নাই; এসবই করা হতো। আমরা ভাবতাম, সমাজতন্ত্র হয়ে যাবে, সবকিছু হবে। সেই লক্ষ্যে উদীচী করেছি, ছাত্র ইউনিয়নকে বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছি।
নাটক লেখা শুরু হলো কীভাবে?
১৯৮৩ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে কাজ করছি। তখনই প্রথম একটা পথনাটক লিখি— ‘মহারাজার অনুপ্রবেশ’। এতটাই জনপ্রিয় হলো তখন যে আমাকে সবাই চিনে ফেলল। তখন একেবারেই আনকোরা মানুষ আমি। উদীচী থেকে এই নাটকের রিহার্সেল শুরু হলো। তখন আমি উদীচীর একনিষ্ঠ নাট্যকর্মী। আমাকে বহুবার নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কখনো সংগঠনের কোনো পজিশনে ঢুকিনি। আমার নাটকে সবাই খুব উৎসাহের সঙ্গে কাজ শুরু করলেন। রিহার্সেল শুরু হলো উদীচীতে। উদীচী এটি করবে স্বৈরাচারবিরোধী, এরশাদবিরোধী নাটক হিসেবে। কিন্তু মহড়া সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর উদীচী বলল, এই নাটক আমরা করতে পারব না। সম্ভবত তারা একটু ভয় পেয়ে গেল, এভাবে স্বৈরাচারবিরোধী নাটক নিয়ে রাস্তায় নামবে। ঠিক আছে, আমাকে তাহলে চলে যেতে হবে। এই উদীচী ছেড়ে চলে আসি।
তারপর?
চলে এসে পল্টন বেজড একটা নাটকের দল করি ‘কারক নাট্য সম্প্রদায়’। থাকতাম শ্বশুরবাড়িতে। ওখানে রিহার্সেল শুরু করলাম। মহারাজার অনুপ্রবেশের টিএসসিতেও রিহার্সেল করি। তখন তো টিএসসিতে প্রচণ্ডভাবে সারা দিন আবৃত্তি, কবিতা পাঠ, নাটকের রিহার্সেল, গানের মহড়া সবকিছু চলত। আমরা রিহার্সেল করতে করতে ১৯৮৪ সালে প্রথম বাংলা একাডেমির মেলায় নাটকটি নিয়ে এলাম। মানুষ প্রথম দেখল, ঢোল নিয়ে লুঙ্গি পরে মাথায় লাল ফেট্টি বেঁধে একদল লোক মেলার মধ্যে ঢুকে গেল এরশাদের আমলে। টোটাল নাটকটাই সরাসরি হলো। এই মহারাজা কিন্তু এরশাদ। অনুপ্রবেশ মানে অবৈধ প্রবেশ। প্রথম শোতে কিন্তু কোনো মাইক্রোফোন ব্যবহার করিনি আমরা; খালি গলায় কাজ করেছি। এই সময়টাই আমার কাজগুলো একটা লক্ষ্য অর্জনের জন্য করা বা একটা জীবনপণ করতে নামা। এই সময়টা চুরাশি। আমরা এমনও হয়েছে, খালি গলায় দিনে চার-পাঁচটা করে শো করেছি।
এরশাদবিরোধী যারা রাজনৈতিক দল, তার মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, এমনকি জামায়াতও ছিল। তারা কিন্তু এসে আমাদের ওই একটু ছোলামুড়ি দিত, ঘুগনি দিত
মানুষের সাহায্য কেমন পেয়েছেন?
তখন ওই এরশাদবিরোধী যারা রাজনৈতিক দল, তার মধ্যে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, এমনকি জামায়াতও ছিল। তারা কিন্তু এসে আমাদের ওই একটু ছোলামুড়ি দিত, ঘুগনি দিত। বলত, আপনারা খেয়েছেন কিছু? খেয়ে নেন। এর পরের শো কোথায়? চলেন, আমরা ভাত খেয়ে নিই। এটা কিন্তু একেবারে সত্যি সত্যি যে, মানুষের পয়সায় আমাদের দুবেলার আহার চলত। বাসায় প্রায় ১৫-২০ জন চলে আসত এবং একটা বড় ভূমিকা রাখত আমার স্ত্রী রুমানা রহমান। নাটক করে বাসায় এলে কস্টিউমগুলো ধুয়ে গুছিয়ে আবার পরের দিনের জন্য রেডি করে রাখত। না হলে ঘামে দুর্গন্ধ হয়ে যাবে। আমার স্ত্রী একজন মহিলা নাট্যকর্মী হিসেবে তার যতখানি দায়িত্ব ছিল, তার চেয়ে বেশি করেছে। এই এতগুলো মানুষকে মাঝেমধ্যে চা করে খাওয়ানো, ভাত রান্না করা— এসব করে কিন্তু এই কারকের দলটাকে এগিয়ে দিয়েছে। মহারাজার অনুপ্রবেশের পর ‘টিয়া পক্ষীর সমাচার’ করলাম। এটি আমাদের দ্বিতীয় নাটক এরশাদ আমলে। তারপর করলাম ‘জাগে লক্ষ নূর হোসেন’।
এই নাটকের জন্ম কীভাবে হলো?
নূর হোসেন মারা গেল ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর। ভাবলাম, নূর হোসেনকে নিয়ে নাটক করতে হবে। ‘জাগে লক্ষ নূর হোসেন’ নাটকটি এতই সাড়া ফেলল যে আমি গোয়েন্দা তালিকায় ঢুকে গেলাম। আমাদের বহু জায়গায় বহুভাবে দৌড়ে পালাতে হয়েছে। কমলাপুরে ওপেন শো করতে গিয়ে আমাদের সাদা পোশাকের পুলিশ এসে মারল। সিভিল ড্রেসে পুলিশ এসে আমাকে কিল-গুঁতা দিল। তারপর মানুষ ঠেকাল। আবার ওখানে নাটক করলাম। এভাবে কিন্তু নাটকটি করা হলো। নূর হোসেন মারা যাওয়ার পর তাকে নিয়ে নাটক করার কারণে আমাদের দলের নাটক করা তখন খুব রিস্ক ছিল। তার মধ্যে রিহার্সেলটা করলাম। মনে আছে, সিদ্ধেশ্বরীতে একটা আন্ডার কনস্ট্রাকশন বাড়িতে ওই যে ছাদ ঢালাইয়ের জন্য বাঁশের পিলারগুলো দেওয়া থাকে না, এই বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে বসে কিন্তু রিহার্সেল করতে হয়েছে, যাতে কেউ টের না পায়। আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে রিহার্সেল করেছি। এরপর আমরা নেমে গেলাম। নূর হোসেনের নাটকের শো করলাম এবং এই নাটকটি আমাদের সবচেয়ে প্রদর্শিত নাটক।
‘জাগে লক্ষ নূর হোসেন’ নাটকের আর কোনো অভিজ্ঞতা?
মজাটা হচ্ছে, আমরা বলি যে নূর হোসেন আওয়ামী লীগের শহীদ। এই নাটক নিয়ে কিন্তু কখনো আওয়ামী লীগের কোনো শো হয়নি। তারা বলেনি যে এটি তুমি আমাদের জন্য করো। তখন আওয়ামী লীগে মন্টু (মোস্তফা মহসীন মন্টু) ছিল, পরে গণফোরামে গেল। ও আমাকে খুব পছন্দ করত। ও মনে হয়, একটা যুবলীগের সম্মেলন না কোথায় গুলিস্তানে এই নাটকের একটি শো করিয়েছিল। ওই আমাদের কিছু টাকা মানে পাঁচ না দশ হাজার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। মতিয়া চৌধুরী এসে কিছু টাকা দিলেন। আমি বললাম, আমরা তো টাকা নিই না। তিনি বললেন যে নাও, রাখো; তোমাদের টাকা লাগে।
আমরা জিহাদের বোন। নূর হোসেন যে কারণে জীবন দিয়েছেন, আমাদের ভাইও তো সে কারণে জীবন দিয়েছে। আপনি আমাদের ভাইকে নিয়ে একটি নাটক করবেন
শহীদ জিহাদের ওপর নাটক কীভাবে করলেন?
নূর হোসেন নাটকটি করার পর একটা সাংঘাতিক ঘটনা হয়েছে। এক সন্ধ্যায় পল্টনে আমার শ্বশুরের বাসায় বসে আছি। আমার তখন চাকরি নেই। একটা মিটিমিটি ৬০ পাওয়ারের ফিলামেন্ট বাল্ব জ্বলছে। এটি আটাশির ঘটনা। হঠাৎ সন্ধ্যায় দেখি, তিনজন মহিলা এলেন। দুজন শাড়ি পরা, একজন সালোয়ার-কামিজ। আমি মনে করছি, এরা ডিবির লোক বা কোনো কিছু। শংকর সাঁওজালের বাসা এটি? জিজ্ঞেস করলেন। তখন আমার স্ত্রীও সবসময় সজাগ থাকত যে, কোনো কিছু হবে এবং আমি একটা ভাঙা ঘরের পেছনের জানালা খুলে বেরিয়ে যাব। এ রকম ১০-১২ দিন ওখান থেকে পালিয়েছি। তো, এরকম একদিন ওনারা আমার বাড়ির দরজায়। তাদের বললাম, হ্যাঁ আসেন। কী ব্যাপার? আমরা একটু শংকর সাঁওজাল; ও আপনি তো... ওরা চিনে ফেলছে। বললাম, বলেন। বলল, আমরা একটু বসতে চাই। বসল। বসার ওরকম কিছু নেই। দুটো মোড়া ছিল আর একটা ভাঙা চেয়ার। বললাম, চা খাবেন? খাব। স্ত্রীকে বললাম, একটু চা বানাও। তারা বললেন, দাদা, এই সন্ধ্যায় এসেছি; আপনাকে একটা কথা রাখতে হবে আমাদের। বললাম, কী কথা বলেন? আমরা জিহাদের বোন। জিহাদ নামে বিএনপির একটি ছেলে ছিল। আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি ওর শহীদ হওয়ার ঘটনাটা বিস্তারিত জানি না। কোথায় কীভাবে? তারা বললেন। সবশেষে বললেন, আমরা তিন বোন এসেছি আপনার কাছে। নূর হোসেন যে কারণে জীবন দিয়েছেন, আমাদের ভাইও তো সে কারণে জীবন দিয়েছে। আপনি আমাদের ভাইকে নিয়ে একটি নাটক করবেন। বললাম, আমি অবশ্যই জিহাদের ওপর নাটক করব।
করেছিলেন?
হ্যাঁ। ওদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছি— উল্লাপাড়া,
সিরাজগঞ্জে। ওদের ওখানে মানে কলেজে নাটকটির শো করেছি এবং আমাদের সফরসঙ্গী ছিলেন তখন পাটমন্ত্রী হান্নান শাহ। সেটি একটি অন্য রকমের সফর ছিল। জিহাদের নাটকের নাম ‘জিহাদ’। আমরা কিন্তু কোনো পক্ষের না। যেটি দেশবিরোধী, মানবতাবিরোধী, সত্যবিরোধী, মঙ্গলবিরোধী; সেখানে কিন্তু আমরা আমাদের এই কাজগুলো করার চেষ্টা করেছি। সেখানে কিন্তু
দল-মত হয় না।
এরপর কী করলেন?
তার পরে আমরা আবার একটা নাটক করলাম ‘সার্কাস’ নামে। অসাধারণ নাটক ছিল। দুই নেত্রীকে স্যাটায়ার করে করা হয়েছিল। তার পরে আমরা একটা নাটক করি ‘আসুন, ইঁদুরের লেজ কাটি’। এটি হচ্ছে আমাদের পথনাটকের পর্ব। এর পরে আমাদের মঞ্চনাটক।
জিহাদ, নূর হোসেন— এই নাটকগুলো কি আপনার লেখা?
সব আমারই লেখা। আমার নির্দেশনা। কিন্তু সর্বতোভাবে তখন তো টিমওয়ার্ক। ‘মহারাজার অনুপ্রবেশ’ খুবই পপুলার হলো। ‘নূর হোসেন’ নিয়ে কিন্তু উনিশশ সাতানব্বইতে কলকাতা থেকে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হলো। পশ্চিমবঙ্গে তখন বামফ্রন্ট সরকার। পশ্চিমবঙ্গের সর্বভারতীয় মুক্ত নাটকের মঞ্চায়নে ভারতের প্রতিটি প্রদেশ থেকে একটি করে দল এলো। দুটো অতিথি দেশ— একটা নেপাল এবং আরেকটা বাংলাদেশকে ওরা আমন্ত্রণ জানাল। এই প্রথম আমরা বাইরে একটা পথনাটকের শো করলাম এবং ওখানে প্রচণ্ডভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করল। ১০ দিনব্যাপী উৎসব ছিল। শুরুর দিনই আমরা নাটকটি করলাম।
শহীদ মিনারে ১৯৮৭ থেকে আজকে পর্যন্ত মানে ঊনচল্লিশ বছর ধরে আমরা একটি আয়োজন করি। ‘এসো রক্তে জেতা বর্ণমালা সুন্দর করে লিখি’— এই শিরোনামে শিশু-কিশোরদের স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ লিখন প্রতিযোগিতা করি। এটি হয় একুশের পরে প্রথম শুক্রবার। অনেক শিশুর হাতেখড়ি হয়
মঞ্চনাটক শুরু করলেন কবে?
এসব কাজকর্মের মধ্যেই আমরা একটি মঞ্চনাটক করি ‘নির্বাসন দণ্ড’। এটিও লেখা আমার, নির্দেশনাও আমার। এই নাটকও বেশ ভালো হয়েছিল।
টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করলেন কবে?
তখন এশিয়াটিকে চাকরি করি, ১৯৯১ সাল। নূর (আসাদুজ্জামান নূর) ভাই হঠাৎ একদিন বললেন, ‘তুমি যাও তো একটু, আতিক (আতিকুল হক চৌধুরী) ভাইয়ের রুমে যাবে। যদি কাজটা পারো, করে দিয়ে এসো কিন্তু।’ বললাম, ‘ঠিক আছে।’ যাওয়ার পর আতিক ভাই একটি খাতা এগিয়ে দিলেন। ওপরে লেখা ‘কুসুম’, হুমায়ূন আহমেদের লেখা। খুলে দেখলাম, নাটকের দৃশ্য ভাগ করা। আমার চরিত্র পড়লাম। এই আমার টেলিভিশনের প্রথম নাটক ‘কুসুম’, হুমায়ূনের দুই পর্বের নাটক। তার পরে করলাম কাজী নজরুল ইসলামের ‘মৃত্যুক্ষুধা’। সৈয়দ শামসুল হকের ‘কবি’ করেছি। সেলিনা হোসেনের ‘অপরাধ’ করেছি। মমতাজ উদ্দীন আহমদের দুটি নাটক করেছি, নাম মনে নেই। আমি কিন্তু খুব কম নাটক করা মানুষ।
নাট্যচর্চার বাইরে আর কী করছেন?
শহীদ মিনারে ১৯৮৭ থেকে আজকে পর্যন্ত মানে ঊনচল্লিশ বছর ধরে আমরা একটি আয়োজন করি। ‘এসো রক্তে জেতা বর্ণমালা সুন্দর করে লিখি’— এই শিরোনামে শিশু-কিশোরদের স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ লিখন প্রতিযোগিতা করি। এটি হয় একুশের পরে প্রথম শুক্রবার। অনেক শিশুর হাতেখড়ি হয়। সাতাশিতে আমাদের অনেক ভাষাসৈনিক বেঁচেছিলেন। যেমন— ইমদাদ হোসেন, গাজীউল হক, মুকুল ভাই, মতিন ভাই (ভাষা-মতিন) এবং অন্য যারা ছিলেন, তারা সবাই কিন্তু এই অনুষ্ঠানে আসতেন। অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে এখনো চলছে। গর্বের সঙ্গে এটি বলি, কোনো স্পন্সর বা অমুক-তমুক ছাড়া সবই কিন্তু আমাদের নাটকের দলের ভেতর থেকে আয়োজনটি করা হয়। প্রতি বছর করা হয়। কারক নাট্য সম্প্রদায় করে। এখানে চারশ-পাঁচশ ছেলেমেয়ে আসে। কখনো কখনো কম হয়। বইগুলো দেন চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর ও সাহিত্য প্রকাশের মফিদুল হক।
জাতীয় পতাকা নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করছেন শুনেছি বহু বছর ধরে?
বর্ণমালার আয়োজনের চার বছর পর থেকে আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে পাঁচ হাজার পতাকা শিশুদের হাতে তুলে দিই। এটির শিরোনাম ‘তোমার হাতে তুলে দিলাম বিজয় পতাকা’। এটি পাইকারিভাবে চকবাজার থেকে কেনা পতাকা না কিন্তু। একেবারে রং, মাপ ঠিকঠাক করে প্রেস থেকে প্রিন্ট করে এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা যারা আমাদের নাটকের দলের— ওরা চার-পাঁচ দিন আগে থেকে মুলি বাঁশ কেটে লাঠিগুলো করে সেগুলো শিরীষ কাগজ দিয়ে ঘষে, যাতে বাচ্চাদের হাত কেটে না যায়, শাড়িতে না ঢোকে এভাবে কিন্তু পাঁচ হাজার পতাকা তৈরি করে। আমি বলব, এটিও একটি বড় কাজ আমাদের জন্য।
টাকা জোগাড় হতো কীভাবে?
এগুলোতে চ্যানেল আই ও এটিএন বাংলা সহযোগিতা করে। আগে প্রথম আলো এগুলোতে প্রচণ্ড সাপোর্ট করত। এই প্রোগ্রামগুলো সত্যি সত্যি আমাদের দলের গর্ব। আমি ১৯৮৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এশিয়াটিকে ছিলাম ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে। লিভার ব্রাদার্স, পেপসি, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স তখন আমাদের ক্লায়েন্ট। আমাকে ভালো লাগার কারণে বা একটি ভালো কাজ করছি বলে তখন সবাই বলত, ‘দাদা আপনি টাকা নেন।’ আমি বলতাম, ‘এটায় স্পন্সর হবে না। বর্ণমালার ওপরে একটা সানসিল্ক বা লাক্স সাবান ঝুলবে, এটি আমি করতে পারব না। আপনারা কি এর বাইরে টাকা দিতে পারবেন? পারবেন না। টাকা দিলেই এগুলো ঝুলবে। অ, আ-র চেয়ে বড় হয়ে যাবে এগুলো। আপনাদের কথামতো করতে হবে। আপনাদের সিইও এসে এখানে বক্তব্য দেবে। এটি হলে আর এই অনুষ্ঠানটার ক্যারেক্টার থাকবে না।’ এই অনুষ্ঠানও আমরা করে চলছি। আমাদের কারকের যে প্রথম দিকের ছেলেমেয়েগুলো, এরা কেউ কেউ বাইরে থাকে, বিভিন্ন কাজ করে। ওরা অনুষ্ঠানের আগে বলে, ‘দাদা, আপনার একা করতে হবে না। আমি টাকা পাঠাচ্ছি।’ কেউ ২০ হাজার, কেউ ২৫ হাজার এভাবে টাকা পাঠায়। ৩৯ বছরের ৩২ বছর একদম নিজের টাকায় করেছি। কারণ, আমি অনেক বেতন পেতাম ওখানে। দুই লাখ-আড়াই লাখ টাকায় এটি চলে যেত। আর কিছু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, যেমন— চ্যানেল আই সাহায্য করে। আমরা একটি প্রমো করি ইভেন্টটির আগে, ৩০ সেকেন্ডের। ওরা কিন্তু অনুষ্ঠানের পাঁচ দিন আগে থেকে চালায়।
এই কাজগুলো কেন করছেন?
এসব কাজ যখন আমরা প্রথম শুরু করি, তখন আমাদের নাট্যবন্ধুরাই বলত— তোমরা নাটক করো, এসব তোমাদের করার দরকার নেই। আমি বলি, এই দরকারটা ছিল জরুরি যে, সবকিছু নির্মাণের আগে একটা জাতি নির্মাণ করা দরকার ছিল আমাদের। আমাদের আপন বোধ, আপন সংস্কৃতি, ভাবনার জায়গা তৈরি হোক শৈশবে; যাতে মস্তিষ্কগুলো সেভাবে বেড়ে ওঠে। ‘রক্তে জেতা বর্ণমালা’ যখন পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রম করে, তখন সীতানাথ বসাকের আদি আদর্শলিপি, একেবারে কালার করলাম। আদর্শলিপির ওই যে একটা দীনহীন দশা ছিল, এখনকার বাচ্চাদের ওইরকম ঝকমকে বইয়ের পাশে ওটাকে খুব অনুচ্চ মনে হতো। তারপর এটার ওপরের প্রচ্ছদটা করে দিলেন শিশির ভট্টাচার্য্য বিনা পয়সায়। উপহারপত্রটা করে দিলেন রনবী। মাঝখানের ছোট ছোট ডিজাইন করে দিল তাপস নামে ঝালকাঠির এক শিল্পী। টোটাল শিল্পনির্দেশনা বিনামূল্যে করে দিল মিতা মেহেদী নামের একটি মেয়ে। এরা সব কিন্তু এভাবে কাজটা করে দিল এবং বাদবাকি দুই লাখ টাকার মতো আমরা দিয়ে এটিকে প্রিন্ট করলাম। সেটি সবাই খুব পছন্দ করলেন। এটির একটি ডিমান্ড হলো। আমার মনে হয়, আগামী বছর আবার নতুন এক হাজার দ্বিতীয় মুদ্রণ করতে হবে। একটি আদর্শলিপি কিন্তু আমরা বানিয়েছি এবং এটির সঙ্গে যুক্ত হলেন সুন্দর হাতের লেখার একটি সংগঠন, খোরশেদ আলম ভূঁইয়া নামে একজন মানুষ; যিনি আমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেটগুলো নিজের হাতে লিখে দেন। তার হাতের লেখা খুব সুন্দর। এই খোরশেদ আলম ভূঁইয়া আন্তর্জাতিক হ্যান্ডরাইটিং কম্পিটিশনে প্রথম পুরস্কার পেয়েছেন। আমার মজা লাগে, তিনি এই পুরস্কার পাওয়ার পরে ১০ দিন পর্যন্ত খুলে দেখেননি। তার ইচ্ছা, ফেব্রুয়ারিতে কারকের অনুষ্ঠানে ওপেন করবেন। তাই করলেন। এই রকম সব অভাবনীয় ব্যাপার আমাদের এই যাত্রায় আছে। এসব আমার একার বিষয় না। সম্মিলিত ও সপ্রাণ মানুষ না হলে এগুলো এগিয়ে নেওয়া অসম্ভব।
আপনি ছবি অাঁকেন ও ছবি তোলেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় সিরামিকসে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও একজনের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে ওখানে পড়ালেখা করা হয়নি। আমি আর ভাস্কর মৃণাল হক একত্রে ভর্তির সব কাজ করেছিলাম। এরপর তো আমি উদীচীর বিভিন্ন কাজকর্মে জড়িত হয়ে গেলাম। ছবি অাঁকা নিজের ভেতরে আছে। বিভিন্ন লোকের বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিই। ছবি আমি ওভাবে অাঁকি না; কিন্তু ছবি তোলা আমার বড় নেশা। আমার বাবা ১৯৬৭ সালে এক কাবুলিওয়ালার কাছ থেকে সুদে সাড়ে ৩০০ টাকা ধার িনয়ে আগফা-আইসোলা ক্যামেরা কিনে দেন। আমার ছবি তোলার গুরু মলয় ঘোষের কাছ থেকে ছবি প্রিন্ট করা থেকে যাবতীয় কাজ শিখেছি। এশিয়াটিক ছাড়ার পর থেকে ছবি তোলাই আমার প্রধান কাজ। আমার তোলা সাদা-কালো ছবি নিয়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করব। প্রকৃতি এবং মানুষের পোর্ট্রেট বেশি তুিল। এখন ছবি নিয়েই থাকি। আর ফ্রিল্যান্স ডকুমেন্টারি, বিজ্ঞাপনের কাজ কেউ ডাকলে করে দিই। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারের ডকইয়ার্ড আমার ছবি তোলার প্রিয় জায়গা।
(২০ এপ্রিল, ২০২৬, পান্থপথ ঢাকা)








