শিল্পে গ্যাসের হাহাকার, উৎপাদন শূন্যের কোঠায়
- কারখানা গ্যাসের সরবরাহ কমে যাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে
- এভাবে চলতে থাকলে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
- লোডশেডিং সমন্বয় আর দিন গোনা ছাড়া উপায় নেই: বিদ্যুৎমন্ত্রী

ফাইল ছবি
গ্যাসসংকটের মধ্যেই দেশ জুড়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল লোডশেডিং। এতে নাজেহাল অবস্থায় পড়েছিল সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ। যানবাহনেও মিলছে ন্যূনতম গ্যাস। এতে লোডশেডিং কিছুটা কমলেও কারখানায় শুরু হয়েছে গ্যাসের হাহাকার। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন। হুহু করে কমছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের উৎপাদনও। উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। এমন পরিস্থিতিতে কোনো আশার কথা শোনাতে পারেনি সরকার। উল্টো বিদ্যুৎমন্ত্রী বললেন, লোডশেডিং সমন্বয় আর দিন গোনা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
সম্প্রতি মহেশখালীতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। এ ছাড়া দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি কেন্দ্র ও আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া বিল জমে যাওয়ার কারণেও এ নিয়ে জটিলতা বেড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ১০ আগস্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের উন্নতি হওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল সরকার। তবে কয়েকদিন ধরে উল্টো সরবরাহ কমেছে। আজ সরবরাহ আরও কমতে পারে। এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞ এবং খাতসংশ্লিষ্টদের।
গত বুধবার সচিবালয়ে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সেখানে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়, আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস পাবে। এর পর থেকেই মূলত শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়।
গ্যাস বিতরণ কোম্পানির দুজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শিল্পে গ্যাস বন্ধে উৎপাদন ব্যাহত হবে। শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে— এ বিষয়গুলো তারা কোনোভাবেই বোঝাতে পারেননি।
গতকাল ঢাকায় সিডিডির এক অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দেশের শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান গ্যাসসংকট নিরসনে সরকারের সীমিত সামর্থ্য ও বর্তমান কাঠামোগত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তার ভাষ্য, ‘ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। এখন শুধু আমাকে দিন গোনা ছাড়া আর ওই যে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন এফএসআরইউতে, এটি করা ছাড়া আমার কিছু নেই। আর কিছু ম্যানেজমেন্ট করা, যাতে কম লোডশেডিং হয়। যাতে আমি ইন্ডাস্ট্রিকে গ্যাস দিতে পারি, এই ম্যানেজমেন্ট করা। এ ছাড়া আপনিই বলেন আমার হাতে আর কী থাকতে পারে।’
গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি: পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট। এখন দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। এর থেকে সার উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৪ কোটি ঘনফুট। বাকি ৮৫ ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে কারখানা, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনরোষ সামাল দিতে বিদ্যুতের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ফলে সবমিলে গড়ে শিল্পে ৫৫-৬০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে এখন।
কর্মকর্তারা বলছেন, শনিবার দুপুর নাগাদ সামিটের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা রয়েছে। এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার চালুর পর অন্যটিরও মেরামত শেষ হয়েছে। এখন সেটি পরীক্ষার জন্য দুটি বয়লারই বন্ধ রাখতে হবে প্রায় ৭২ ঘণ্টা। তখন গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাবে।
এদিকে বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি এবং চাহিদা কমে যাওয়ায় গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২৬৩৭ মেগাওয়াট। বেলা ৩টার দিকে লোডশেডিং কমে দাঁড়ায় ৩৭৭ মেগাওয়াটে। আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রায় ৩৪০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল।
শিল্পে গ্যাসের হাহাকার: দুদিন ধরে শিল্পে স্মরণকালের ভয়াবহ গ্যাসসংকট চলছে। কারখানার উৎপাদনে নেমেছে ধস। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পোশাক, রড, সিমেন্ট ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতি কিছুটা পোষানো গেলেও চাল, ডাল, চিনি, আটার মতো পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
সারা দেশে গ্যাস সংযোগ রয়েছে— এমন কারখানার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে তিতাসের শিল্প সংযোগ রয়েছে ৫ হাজার ৬৭৩টি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে গিয়ে এসব শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বেশিরভাগ কারখানায় গ্যাস নেই। কোথাও সারা দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস মিলছে। কিন্তু চাপ এতই কম যে, তা দিয়ে কারখানা চালানো যাচ্ছে না।
গ্যাস-বিদ্যুৎসংকটে বিকল্প উপায়ে কারখানা চালু রাখতে গিয়ে ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা উৎপাদন বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন কখন গ্যাস আসবে।
তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটে কারখানাগুলোতে ৩৫-৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বললেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর পরামর্শ দিলেন লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর। এ ছাড়া শিল্প খাতে জ্বালানি বণ্টনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদও দিলেন তিনি।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আগামীর সময়কে বলছিলেন, কারখানার মালিকরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বিশ্ববাজারে ক্রেতা হারাচ্ছি। উৎপাদন না করেও কর্মীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে, ব্যাংকে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়বে।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সুযোগ আছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে।







