হাতির পিঠে সন্ধ্যা নামুক গারো পাহাড়ে

সংগৃহীত ছবি
সূর্য যখন শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের ওপারে ঢলে পড়ে, তখন গাঢ় হয়ে আসা অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে ওই পাহাড়ি-বাঙালি জনপদে নামে এক অন্য রকমের নীরবতা—এক আতঙ্কের সন্ধ্যা। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাতি জ্বলে ওঠে, হাতে হাতে ওঠে মশাল, কাঁসার বাদ্য আর ঢাকঢোলের শব্দে কেঁপে ওঠে প্রান্তর। খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে নেমে আসা বন্যহাতি ঠেকানোর এই মরিয়া যুদ্ধ কোনো এক রাতের নয়; বছরজুড়ে সীমান্ত জনপদের এটাই দৈনন্দিন বেঁচে থাকার লড়াই। অথচ এই প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নামার কথা ছিল রূপকথার মতো শান্ত ও সৌন্দর্যময় হয়ে; যেখানে বনের বিশাল রাজারা নির্বিঘ্নে ফিরে যাবে তাদের অভয়ারণ্যে।
আজ প্রাণ-প্রকৃতির এই মুমূর্ষু অবস্থার পেছনে একক প্রজাতি হিসেবে মানুষের লুণ্ঠন, বনাঞ্চল দখল আর দায়িত্বহীন খবরদারিই প্রধানত দায়ী। স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে হাতি সবচেয়ে বৃহৎ, তাই তার খাদ্য ও বাসস্থানের চাহিদাও বিপুল। একসময় বাংলাদেশে হাতির উপযোগী যে নিরবচ্ছিন্ন বনাঞ্চল ছিল, স্বাধীনতার পর থেকেই তা ক্রমাগত ধ্বংস ও সংকুচিত হতে শুরু করে।
দক্ষিণাঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, চুনতি-নাইক্ষ্যংছড়ি, রাঙ্গুনিয়া-রাজস্থলী কিংবা টেকনাফ-কক্সবাজারের প্রাচীন হাতি চলাচলের পথ বা 'করিডর'গুলো আজ খণ্ড-বিখণ্ড। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর মহাসড়ক নির্মাণ, জনবসতির বিস্তার, শরণার্থী ক্যাম্প স্থাপন এবং দিনরাত যান চলাচলের কারণে হাতির স্বাভাবিক যাতায়াতের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ময়মনসিংহ, সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শেরপুরের সীমান্ত বনেও একই চিত্র। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা বনে খাবার না পেয়ে ক্ষুধার্ত হাতি যখন লোকালয়ে হানা দেয়, তখন বাঁধে মানুষ-হাতি সংঘাত। জীবন ও জানমালের এই ক্ষয়ক্ষতি আসলে মানুষের তৈরি পরিবেশগত ভারসাম্যের ভুলেরই চরম মাশুল।
স্বজনের মৃত্যুতে হাতির দল দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ ঘিরে রাখে, শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করে এবং পাতা-মাটি দিয়ে ঢেকে সমাধিস্থ করার চেষ্টা করে। এমন ঘটনাও দেখা গেছে—সার্কাসে নির্যাতিত দুটি হাতি বহু বছর পর অভয়ারণ্যে দেখা হলে একে অপরের পুরোনো ক্ষতচিহ্ন শুঁড় দিয়ে ছুঁয়ে সমবেদনা জানাচ্ছে
হাতি কেবল বিশালাকার কোনো বন্যপ্রাণী নয়; বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা ও গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে হাতির চিন্তা করার ক্ষমতা, স্মৃতিকথা এবং পারিবারিক বন্ধন মানুষের মতোই গভীর। ইয়েন ডগলাস-হ্যামিলটন বা রামন সুকুমারদের মতো প্রখ্যাত গবেষকরা দেখিয়েছেন—হাতিদের মধ্যে রয়েছে অসামান্য সহানুভূতি, স্মৃতিশক্তি, এমনকি শোক প্রকাশের ক্ষমতা।
মানুষ যে কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায় না (২০ হার্টজের নিচে), সেই অতিমৃদু ও শক্তিশালী 'ইনফ্রাসোনিক' শব্দতরঙ্গের সাহায্যে হাতিরা বহুদূর থেকে নিজেদের মধ্যে সংবেদন আদান-প্রদান করতে পারে। বিপদ কিংবা শোকের বার্তা তারা এভাবেই ছড়িয়ে দেয় মাইলের পর মাইল।
স্বজনের মৃত্যুতে হাতির দল দীর্ঘক্ষণ মৃতদেহ ঘিরে রাখে, শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করে এবং পাতা-মাটি দিয়ে ঢেকে সমাধিস্থ করার চেষ্টা করে। এমন ঘটনাও দেখা গেছে—সার্কাসে নির্যাতিত দুটি হাতি বহু বছর পর অভয়ারণ্যে দেখা হলে একে অপরের পুরোনো ক্ষতচিহ্ন শুঁড় দিয়ে ছুঁয়ে সমবেদনা জানাচ্ছে।
হাতি বিদ্যুতায়িত বেড়ার ওপর গাছের মোটা ডাল ফেলে তা অকেজো করতে জানে। একইসঙ্গে, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হাতিকে প্রতিশোধপরায়ণও করে তুলতে পারে।
ভারতে আনারসের ভেতরে বাজি ভরে এক গর্ভবতী হাতিকে হত্যা কিংবা গাজীপুর সাফারি পার্কে উদ্ধারকৃত হাতি 'রাজু বাহাদুর'-এর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো আমাদের অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার আয়না তুলে ধরে। রাস্তাঘাটে চাঁদা তোলার নির্মম জীবন থেকে মুক্ত করে এনেও রাজু বাহাদুরকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি—যা আমাদের প্রাণিসংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
সংকট যত গভীরই হোক, উত্তরণের পথ একেবারেই অসম্ভব নয়। ২০১৫ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে স্থায়ী বন্যহাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮টি, পরিযায়ী হাতি ৯৩টি এবং পোষা হাতি ৯৬টি। ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন জরিপ পরিচালনার উদ্যোগের পাশাপাশি 'বাংলাদেশ এলিফ্যান্ট কনজারভেশন অ্যাকশন প্ল্যান (২০১৮–২০২৭)' এর অধীনে ৪০টি অগ্রাধিকারমূলক কাজ চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্ব হাতি দিবস ২০২৬ উদযাপনে জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে শেরপুরের মধুটিলা ও বালিজুরি রেঞ্জ পর্যন্ত 'বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি' প্রতিপাদ্য সামনে রেখে যে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা আশার সঞ্চার করে।
হাতির সুরক্ষা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে বনের গভীরে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বন্ধ করবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মানুষ-হাতি সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
মানুষ যদি প্রাণ-প্রকৃতির প্রধান ধ্বংসকারী হতে পারে, তবে সুরক্ষার মূল চাবিকাঠিও মানুষের হাতেই। শুধু আইনি সনদ বা লোকদেখানো নীতি প্রণয়ন নয়, প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে করিডরগুলো উদ্ধার করা, বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করা এবং হাতির জন্য বনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাদ্যের সংস্থান করা।
গারো পাহাড়ের ঢালে যে দিনটিতে ঢাকঢোল আর আতঙ্কের মশাল জ্বলবে না, যেদিন বনের রাজা হাতিরা সীমান্ত পেরিয়ে আপন অভয়ারণ্যে শান্ত পায়ে ফিরে যেতে পারবে—সেদিনই কেবল এই জনপদে প্রকৃত শান্তি ফিরবে। রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতি টেনে মানুষ ও হাতির এই বন্ধন গড়ে উঠুক; হাতির পিঠেই নেমে আসুক গারো পাহাড়ের কাঙ্ক্ষিত শান্ত সন্ধ্যা।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক






