১০ টাকার শরবতে লাখ টাকার রোগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তীব্র গরমে তৃষ্ণা মেটাতে রাজধানীর ফুটপাত ও সড়কের পাশে ভিড় করছেন পথচারীরা। আর সেই সুযোগে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে নানা রঙ ও স্বাদের শরবত। লেবু, বিট, ফলের টুকরো, বরফ ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে শরবতকে আকর্ষণীয় করে তোলা হলেও তৈরির ক্ষেত্রে অনেক দোকানেই মানা হচ্ছে না প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি।
অনিরাপদ পানি, অপরিষ্কার গ্লাস এবং খোলা পরিবেশে রাখা উপকরণ দিয়ে তৈরি এসব শরবত তৃষ্ণা মেটানোর বদলে ডেকে আনতে পারে ডায়রিয়া, আমাশয়, বমি ও পেটের সংক্রমণসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি। আর এসব রোগ হলে সুস্থ হতে লাখ লাখ টাকা খরচ হতে পারে নিমেষেই।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও ব্যস্ত এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ভ্রাম্যমাণ শরবতের দোকানগুলোয় বড় পানির পাত্রে তৈরি করা হচ্ছে শরবত। আশপাশেই রাখা হচ্ছে লেবু, ফল, চিনি, মসলা ও অন্যান্য উপকরণ। তবে শরবত তৈরিতে ব্যবহৃত পানি কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। একই সঙ্গে অনেক দোকানে ব্যবহৃত গ্লাস ভালোভাবে পরিষ্কার করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই।
অন্যদিকে তৈরি করা শরবত ও বিভিন্ন উপকরণ অনেক সময় খোলা অবস্থায় রাখা হচ্ছে। এতে রাস্তার ধুলোবালি, যানবাহনের ধোঁয়া ও জীবাণু সহজেই পানীয় ও উপকরণে মিশে যাচ্ছে। শুধু পানি নয়, শরবতে ব্যবহৃত বরফও কতটা নিরাপদ, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
রাজধানীর ফার্মগেটে লেবুর শরবত বিক্রি করা সাইফুল বলেন, ‘আমি যে শরবতটা বিক্রি করি, সেটা নিজে দিনে ২-৩ গ্লাস খাই এবং যে ছেলেটা সকালে আমাকে বরফ দিয়ে যায়, সে-ও প্রতিদিন এক গ্লাস খেয়ে যায়। ক্ষতিকর হইলে কী আর আমি খাইতাম!’
গ্লাস ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবার একজন শরবত খাওয়ার পরে গ্লাস ধুই।’ তবে গ্লাস ধোয়ার জন্য নির্দিষ্ট বালতির পানি দিনে কয়বার পরিবর্তন করা হয় এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
শুধু রাস্তার ধারের দোকান নয়, অনেক রেস্তোরাঁতেও অপরিচ্ছন্ন গ্লাসে এবং ফল না ধুয়ে শরবত পরিবেশন করা হয়
শরবতে ব্যবহৃত বরফ সম্পর্কে রাজাবাজার এলাকায় বরফ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক শাহ জালাল বুলবুল বলেন, ‘যে বরফটা শরবতের জন্য দেই, সেটা নিরাপদ। আমরা দুই ধরনের বরফ বিক্রি করি। একটার দাম ৬০ টাকা, আরেকটা ১২০ টাকা। ৬০ টাকার বরফটা আমরা তৈরি করি মাছ বিক্রেতা এবং বাহ্যিক কাজের জন্য। আর ১২০ টাকার বরফটা খাবার উপযোগী হওয়ায় শরবতের দোকানে এবং রেস্তোরাঁগুলোতে দেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘শরবতের দোকানে আমরা যেটা সরবরাহ করি, সেটা পাম্পের নিরাপদ পানি ব্যবহার করে তৈরি। কেউ যদি নিম্নমানের মাছ ব্যবহারের বরফ দিয়ে খাবার শরবত তৈরি করে, সেটা তার দোষ।’
কারওয়ান বাজারের ভ্রাম্যমাণ শরবত বিক্রেতা জহিরুল অবশ্য বলেছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা ওয়াসার পানি দিয়েই শরবত বানাই, যেটা ঢাকা শহরের সবাই বাসায় খায়। সেটা ক্ষতিকর না হলে শরবত কেন ক্ষতিকর হবে?’
পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো সবার সামনেই শরবত বানাচ্ছি, মানুষ খাচ্ছেও। যদি কারও কাছে মনে হয় অপরিষ্কার, সে খাবে না। আমি তো জোর করে কাউকে খেতে বলছি না।’
দুপুরের রোদে ক্লান্ত রিকশাচালক শরিফুল কারওয়ান বাজার চত্বরে এসে এক গ্লাস লেবুর শরবত খান। মাত্র খাওয়া শরবতটি পরিচ্ছন্ন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টাকা খরচ করে আমি তো আর ক্ষতিকর কোল্ড ড্রিংস খাই নাই, খাইলাম এক গ্লাস লেবুর শরবত। সেটাও যদি ক্ষতিকর হয় তাইলে খাব কি?’
ফলের শরবতের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতে দেখা যায় তোকমার শরবতও। কারওয়ান বাজার এলাকায় এমনই এক দোকানে তোকমা ভিজিয়ে রাখতে দেখা যায় একটি অপরিচ্ছন্ন বালতিতে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিক্রেতা মো. দেলোয়ার বলেন, ‘আমি শাহবাগে বসি। আজ বৃষ্টি হয়েছে বলে এখানে বসেছি। বৃষ্টি হওয়ায় বালতির বাইরে ময়লা জমলেও ভিতরে পরিষ্কার।’
শরবতের টকটকে রঙ কীভাবে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি লাল ড্রাগন ফল ব্যবহার করি, তাই রঙ ভালো হয়।’ তবে তার কাছে ড্রাগন ফল দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘গরমে ফলের শরবত খাওয়া ক্ষতিকর কিছু না। এতে শরীরের পানি স্বল্পতা পূরণের পাশাপাশি কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। তবে নিশ্চিত করতে হবে যে ফলসহ শরবতের সকল উপকরণ ও বিক্রেতার হাত যেন পরিষ্কার থাকে। না হলে কোনো খাবারই নিরাপদ নয়, এমনকি বাসার খাবারও নয়।’
তিনি বলেছেন, শুধু রাস্তার ধারের দোকান নয়, অনেক রেস্তোরাঁতেও অপরিচ্ছন্ন গ্লাসে এবং ফল না ধুয়ে শরবত পরিবেশন করা হয়। সেখানেও একই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে।
নিরাপদ পানি ব্যবহার না করলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে মুশতাক হোসেন বলেন, ‘নিরাপদ পানি যদি ব্যবহার করা না হয়, তবে সব ধরনের পানিবাহিত রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পেটের পীড়া ও সংক্রমণ, ডায়রিয়া, আমাশয় এবং জন্ডিসের মতো রোগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যদিও দীর্ঘমেয়াদে কিছু পানিবাহিত রোগ হয়, যেমন হেপাটাইটিস-এ এবং হেপাটাইটিস-ই।’
শরবতের আকর্ষণীয় রঙ নিয়েও সতর্ক করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, ‘অনেক রেস্তোরাঁ এবং জুসের দোকানে আকর্ষণীয় দেখানোর জন্য কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়। ফুড গ্রেড রঙ ব্যবহার করলে ক্ষতি নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে ফলের জুসের দাম অনেক বেশি হবে বিধায় বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ মালিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল রঙ ব্যবহার করে থাকেন। এসব রঙ দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি করতে সক্ষম।’
শরবতে ব্যবহৃত বরফ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। এ বিষয়ে মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘নিরাপদ পানি ব্যবহার করে যদি বরফ বানানো হয়, তবে তাতে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। কিন্তু কোনো দোকান বা রেস্তোরাঁ মালিক মাছ-মাংসে ব্যবহার করার বরফ দিয়ে শরবত পরিবেশন করলে তাতে টাইফয়েড এবং হেপাটাইটিস-এ ও ই-এর মতো রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’
এমনকি ঘরে বরফ তৈরির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘ঘরের ফ্রিজেও যদি বরফ বানাতে হয়, সেই ফ্রিজে মাছ-মাংস রাখা যাবে না। রাখলে তাতেও স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকবে।’
সব মিলিয়ে গরমের তীব্রতায় কয়েক মিনিটের তৃষ্ণা মেটাতে ফুটপাতের কম খরচের শরবত অনেকের কাছে সহজ ও সাশ্রয়ী সমাধান হলেও এর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে থেকেই যাচ্ছে প্রশ্ন। একইভাবে অভিজাত রেস্তোরাঁগুলোয় একই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে কিনা তা নিয়েও আছে প্রশ্ন। বলা যায় এসব পানীয় যেকোনো সময় ডেকে আনতে পারে লাখ টাকার রোগ। তাই তৃষ্ণা মেটানোর আগে শরবত তৈরির পানি, বরফ, গ্লাস ও পরিবেশের পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ আইইডিসিআরের সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার।






