খাবার পরিবেশনে খবরের কাগজ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

এভাবেই খবরের কাগজ কিংবা বইয়ের কাগজে বিক্রি হয় খাবার
চটপটি, ঝালমুড়ি, পুরি-শিঙাড়া কিংবা ভাজাপোড়া, রাস্তার পাশের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ছোট রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশনে এখনো বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে পুরনো খবরের কাগজ বা ছাপানো বই-খাতার কাগজ। খাবার মোড়ানো থেকে শুরু করে প্লেটের নিচে বিছানো কিংবা হাত মোছার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে এসব কাগজ।
কম খরচ ও সহজলভ্যতার কারণে বিক্রেতাদের কাছে এসব কাগজ সুবিধাজনক হলেও, এতে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ও ভারী ধাতু খাবারের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে তৈরি করতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাৎক্ষণিকভাবে পেটের পীড়া ও খাদ্যবাহিত রোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে লিভার, কিডনি ও শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার চত্বরে খবরের কাগজে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেছেন, ‘২০ বছর যাবৎ আমি এখানে ব্যবসা করছি। এখনো কোনো ক্রেতা কোনো প্রকার অভিযোগ করেননি।’
খবরের কাগজে খাবার পরিবেশন নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলছেন, ‘এগুলো তো দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। সরকার তাহলে নিষিদ্ধ করে না কেন?’
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘খবরের কাগজ মূলত ব্যবহৃত কাগজ পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে খাতা-বই ব্যবহারের পর কাগজ শুকিয়ে তা নিউজপ্রিন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব কাগজ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় হাত মোছা, প্লেট মোছা এবং প্লেটের ওপর বিছিয়ে খাবার পরিবেশনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দুইবার দূষিত হওয়ায় খাদ্যবাহিত রোগের অন্যতম বাহন হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘খবরের কাগজের মাধ্যমে পেটের পীড়া, ডায়রিয়া, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি খবরের কাগজের কালিতে থাকে সিসা এবং নানান ভারী ধাতু, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।’
মুশতাক হোসেনের ভাষ্য, ‘এসব ভারী ধাতু শরীরে প্রবেশ করলে দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনির বিভিন্ন রোগ হতে পারে। রক্তে সিসা প্রবেশ করলে অ্যানিমিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে এসব ভারী ধাতু জমে গিয়ে লিভারের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি করতে পারে।’
খবরের কাগজের ছাপার কালির বিষয়টির চেয়েও কাগজের দূষণ বড় সমস্যা বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘ভারী ধাতুর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পাশাপাশি এর আগেই দূষিত কাগজের মাধ্যমে পেটের পীড়া ও বিভিন্ন সংক্রমণজনিত রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে।’
খাবার পরিবেশনে খবরের কাগজের ব্যবহার বন্ধে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি। মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ফুড সেফটি অথরিটি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা উচিত।’
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙা শুরু হয় যেদিন, সেদিনই জুলাইয়ের ধ্বংস শুরু হয়েছে
০৯ আগস্ট ২০২৬
তবে সরাসরি অভিযান পরিচালনার আগে জনসচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যারা ঝালমুড়ি বা অন্যান্য খাবার বিক্রি করেন, তাদের আগে নিরাপদ খাদ্য পরিবেশনের বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং ফুড-গ্রেড কাগজ সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত। এরপরও নিয়ম না মানলে অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে ফুড-গ্রেড কাগজ পাওয়া যায় এবং এর দামও তুলনামূলক কম। তাই এসব কাগজের সরবরাহ বাড়াতে হবে। নিরাপদ কাগজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত না করে শুধু অভিযান পরিচালনা করলে কিছুদিন পর বিক্রেতারা আবার খবরের কাগজ ব্যবহার শুরু করতে পারেন।’
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্রেতা বলেন, খবরের কাগজে খাবার খাওয়ার চেয়ে প্লাস্টিকের পলিথিনে খাবার খাওয়া বেশি ক্ষতিকর বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘মন্দের ভালো হিসেবে কাগজে খাওয়া ভালো।’ বিক্রেতাদের খরচ কম হওয়ায় তারা খবরের কাগজ ব্যবহার করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খাবার পরিবেশনে খবরের কাগজের ব্যবহার বন্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। একই সঙ্গে বাজারে ফুড-গ্রেড কাগজের সহজলভ্যতা ও সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ।
তার মতে, নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত করা গেলে কম খরচের জন্য খবরের কাগজ ব্যবহারের প্রবণতা কমানো সম্ভব। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারিও জরুরি।





