পারশা মাহজাবিন
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙা শুরু হয় যেদিন, সেদিনই জুলাইয়ের ধ্বংস শুরু হয়েছে

পারশা মাহজাবিন। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
গত ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ কনসার্টে দর্শক সারি থেকে আর্ক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসানকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছুড়ে মারার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন সংগীতশিল্পী পারশা মাহজাবিন।
ওই কনসার্টে নিজেও পারফর্ম করা এই শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশের মাধ্যমে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক নৈতিকতা নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন তোলেন।
ভিডিও বার্তায় পারশা মাহজাবিন বলেছেন, ‘একজন শিল্পীর মুখে ছুঁড়ে মারা একটি বোতল, আজকে আমাকে শুধু শিল্পী নিরাপত্তা নয়, জুলাইয়ের নৈতিকতার পরিণতি নিয়ে কথা বলতে বাধ্য করছে। প্রশ্নটি এখন আর শুধু এই নয় যে হাসান ভাইয়ের দিকে কে বোতল ছুঁড়ে মেরেছে, প্রশ্নটি আসলে যে জুলাই মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল, সেই জুলাইয়ের মঞ্চেই একজন শিল্পীর মর্যাদা পদদলিত হলো কীভাবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত ৫ আগস্ট বর্ষা বিপ্লবের গান কনসার্টে আমিও পারফর্ম করেছি, সেখানে আর্ট ব্যান্ডের ভোকালিস্ট হাসান ভাইয়া, তাকে লক্ষ্য করে দর্শক সারি থেকে পানির বোতল ছুঁড়ে মারা হয়েছে এবং তাঁর মুখে, আমি এই ঘটনায় গভীরভাবে ব্যথিত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত। হাসান ভাইয়ের দিকে ছুঁড়ে মারা বোতলটি শুধু একজন ব্যক্তি হাসানের গায়ে লাগেনি, পুরো শিল্পী সমাজের মর্যাদায় আঘাত করেছে।’
জুলাই আন্দোলন নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘জুলাই কোনো দল, গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের নামে কাউকে দেশপ্রেমের সনদ দেওয়া কিংবা কারোর নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই।’
আন্দোলনের অর্জনের অবক্ষয় তুলে ধরে তিনি শেখ হাসিনার পোশাক নিয়ে উল্লাস করা এবং সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন ভাঙচুরের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেছেন, ‘আচ্ছা জুলাইয়ের অর্জন কি সেদিনই ধূলিসাৎ হয়নি যেদিন শেখ হাসিনার অন্তর্বাস দাবি করে একটি নারীর প্রাইভেটগার্মেন্টস নিয়ে উল্লাস করেছিলেন? জুলাইয়ের ধ্বংস কি সেদিন থেকে শুরু হয়নি যেদিন থেকে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো ভাঙা শুরু হয়েছে? একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে একবারই ১৯৭১ সালে। জুলাই সফল হয়েছিল কেবল কয়েকজন সমন্বয়ক, নেতা কিংবা রাজনৈতিক কর্মীর কারণে নয়, আমাদের মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল বলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, শিল্পী সাধারণ নাগরিকের সাহসই কিন্তু আসল শক্তি ছিল।’
সংগীতশিল্পী পারশা মাহজাবিন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য ও মর্যাদার জায়গাটি তুলে ধরেছেন। তার মতে, বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন হয়েছে একবারই—১৯৭১ সালে।
‘স্বাধীনতা একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়, আর গণঅভ্যুত্থান একটি বিদ্যমান রাষ্ট্রকে স্বসংস্কার, সংশোধন এবং জবাবদিহিতার পথে ফিরিয়ে আনার দাবি জানায়। দুটির ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে, কিন্তু দুটোকে এক করা হলে ১৯৭১ ও ২০২৪ দুটি ইতিহাসের প্রতিই অবিচার করা হয়। আমরা আইনের শাসন চাই, মবের শাসন নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না যেখানে আমি যাকে পছন্দ করি তাকে দেশপ্রেমিক আর যাকে পছন্দ করি না তাকে দেশদ্রোহী বলব।’ বলেছেন পারশা।
পারশা আরও বলেছেন, ‘আমরা সবাই অন্য মানুষটিকে নিজের মতো করে তৈরি করতে চাই। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য হলো তোমাকে আমার মতো হতে হবে না। ভিন্ন মতের হয়েও আমরা সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে এই দেশে বসবাস করতে পারব। এক সময়ে বঙ্গবন্ধুর অন্ধ বন্দনা এই দেশে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল এবং মহান মুক্তিযুদ্ধকে এক প্রকার বিষিয়ে তোলা হয়েছিল সাধারণ মানুষের কাছে।’
আইনের শাসনের বদলে ‘মব জাস্টিস’ বা মব শাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে পারশা ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ ঘৃণার রাজনীতির সমালোচনা করেন। নিজের স্কুলের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি জানান, ‘আমি এটার নিজেই ভুক্তভোগী, একবার স্কুলের প্রোগ্রামে আমাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইতে দেওয়া হয়নি, জেমসের এই গানে শহীদ জিয়ার নাম থাকার কারণে। তখন আমাকে ১০ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান তুলতে হয়েছিল। স্কুলের অ্যাডমিন থেকেই এই ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি সেই মানুষটাকেই অন্ধভাবে ঘৃণা করাটাই দেশপ্রেমের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
‘আমি ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাসী নই, একই সঙ্গে ইতিহাস মুছে ফেলার রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করিও না। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির সমালোচনা করা যায়, তার রাজনৈতিক ভুল নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু ইতিহাসকে প্রতিদিনের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ভালোবাসা বা ঘৃণার সুইচ দিয়ে পরিচালনা করা যায় না।’ যোগ করেন পারশা।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বশীলতার অভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রধানত দুটো বিষয় তুলে ধরেন। প্রথমত, জেনজি ও সংবিধান প্রসঙ্গ। তিনি বলেছেন, ‘সংবিধান অবশ্যই আলোচনা, সমালোচনা ও সংশোধনের বিষয় হতে পারে। কিন্তু একটি প্রজন্মের নাম ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে পুরো প্রজন্মের সিদ্ধান্ত বলে ঘোষণা করাটা আসলে গণতান্ত্রিক আলোচনা হতে পারে না।’
দ্বিতীয়ত, তিনি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার শব্দের বিকৃতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় দাঁড়িয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র ‘মরু’ হয়ে যায় ‘গরু’, তখন আসলে হাসলেই এটার দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং শঙ্কিত হতে হয়। কবি নজরুলের কবরের অন্য যে পাশটা আছে সেটা কবে যেন তিনি দখল করে নেন। নজরুলকে উদ্ধৃত করলেই নজরুলের উত্তরাধিকার অর্জন করা যায় না। তার উত্তরাধিকার ধারণ করতে হলে তার সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি দায়বদ্ধতা ধারণ করতে হয়। দেশপ্রেম বলতে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকা।’
দেশপ্রেম নিয়ে পারশা বলেছেন, ‘ভিন্ন মতের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশপ্রেম। ভয়মুক্ত সংস্কৃতি অব্যাহত রাখা দেশপ্রেম। আমরা সকলে ভালো সরকার চাই কিন্তু কেউ ভালো নাগরিক হতে চাই না। আমাদের কোনো সিভিক সেন্স নেই। রাস্তাঘাটে যার যা মন চায় ফেলে দিই। আমাদের নদী, সমুদ্রের দিকে তাকালেই আসলে বোঝা যায় আমরা জাতি হিসেবে কেমন। আমরা নিজেরা সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙি, মিথ্যা বলি, অন্যায় সুবিধা নিই, দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে ফেলি। তারপর সরকারের কাছে শতভাগ সততা আশা করি। এ কথার অর্থ এই নয় যে এতে রাষ্ট্রের দায় কমে যায়। রাষ্ট্রের দায় অবশ্যই সব থেকে বেশি, তবে নাগরিকের দায়ও শূন্য নয়।’
পারশা মাহজাবিন স্পষ্ট করেন যে, শুধু নতুন সরকার এলেই নতুন বাংলাদেশ তৈরি হয় না। ‘আমাদের সমাজের মূল্যবোধ, অসততা, সহিংসতা ও ক্ষমতার সংস্কৃতি এক সময় রাস্তার ভিতর প্রতিফলিত হয়। তাই নতুন বাংলাদেশ শুধু নতুন সরকার দিয়েই তৈরি হবে না, নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন নাগরিক নৈতিকতা এবং ভিন্ন মতের ওপর সহনশীলতা দিয়ে। নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন শত্রুর তালিকা নয়, নতুন বাংলাদেশ মানে পুরোনো সহিংসতার সঙ্গে নতুন স্লোগান জড়িয়ে দেওয়া নয়।’
ভিডিওর শেষে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নতুন বাংলাদেশ মানে নতুন শত্রুর তালিকা তৈরি করা কিংবা পুরোনো সহিংসতার ওপর নতুন স্লোগান চাপিয়ে দেওয়া নয়। ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা ও ভয়মুক্ত পরিবেশ না থাকলে কেবল জুলাইয়ের নামে মঞ্চ বানিয়ে আন্দোলনকে সম্মান জানানো সম্ভব নয়।





