পড়ার ফাঁকে ব্যবসা
খুবি থেকে সুদূর চীনে

কাজী ফাহাদুল ইসলাম
১০ জোড়া জুতা বিক্রি করে লাভ করেছিলেন ১ হাজার টাকা। সেই ব্যবসার মূলধন এখন ৭০ লাখ টাকা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমনই উদ্যোগের গল্প লিখেছেন মিরাজুল ইসলাম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পাশের ময়ূরী আবাসিক এলাকার খালাসির মোড়ে ছোট্ট একটি অফিস। ভেতরে চলছে আমদানি-রপ্তানি, ঠিকাদারি, মেশিনারিজ, মেডিসিন, কসমেটিকস ও ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবসা। এই প্রতিষ্ঠানের গল্প একটু আলাদা। এর উদ্যোক্তারা কেউ প্রচলিত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান নন। তারা সবাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অথবা সাবেক শিক্ষার্থী।
উদ্যোগটির নাম ডেল্টা ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী কাজী ফাহাদুল ইসলাম। পরিচালক হিসেবে আছেন সাবেক পাঁচ শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জুবায়ের, মুজাহিদুল ইসলাম, মৃম্ময় বিশ্বাস, নাসরিন আক্তার ও আলহাজ্ব।
এই ব্যবসার বীজ বোনা হয়েছিল করোনার শুরুর দিকে, ২০২০ সালের মার্চে। মহামারীর সংক্রমণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম তখন বন্ধ ছিল। ঘরবন্দি সময়টাকে অন্যভাবে কাজে লাগানোর চিন্তা করছিলেন ফাহাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আমদানি ব্যবসার খুঁটিনাটি শেখা শুরু করেছিলেন। তারপর উদ্যম ও ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
শুরুর দিকে এক সহপাঠীকে ব্যবসার পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সাত দিনের মাথায় সেই সহপাঠী সরে যান। তবু ফাহাদ থামেননি; বরং ব্যর্থতার আশঙ্কাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। প্রথমবার চীন থেকে মাত্র ১০ জোড়া জুতা অর্ডার করেন। অনলাইন পেজের মাধ্যমে সেগুলো পাইকারি বিক্রি করা হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে মাত্র এক হাজার টাকা। অঙ্কটা বড় ছিল না। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নের জন্য ওই সামান্য টাকাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এতে বুঝতে পারেন, পরিকল্পনা করে এগোতে পারলে আমদানি ব্যবসায় টিকে থাকা সম্ভব। এরপর প্রায় এক লাখ টাকার লাইটার আমদানি করেন। এবার লাভ হয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ব্যবসার কৌশলটাও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে তার কাছে। বাজারে গিয়ে আগে পণ্যের চাহিদা যাচাই, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনে অগ্রিম টাকা গ্রহণ এবং সেই অর্থ দিয়ে পণ্য আমদানি করা— এই পদ্ধতিতেই এগোতে থাকেন।
আমদানি করা পণ্য ফাহাদের হাতে আসার পর অল্প সময়ের মধ্যে বিক্রি হয়ে যেত। সেই লাভের অর্থ আবার নতুন পণ্যে বিনিয়োগ করতেন। এভাবেই ছোট ছোট বিনিয়োগ থেকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। ফাহাদ বললেন, ‘আমি নিশ্চিত ছিলাম, আমাদের ব্যবসা একদিন সফল হবে।’ করোনার সেই কঠিন সময়ে শুরু হওয়া ছোট উদ্যোগটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। আমদানির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ, ঠিকাদারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ খুঁজতে থাকেন।
তবে পথটি সব সময় মসৃণ ছিল না। বৈধ প্রক্রিয়ায় আমদানি করা একটি চালানও একসময় অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আটকে যায়। এর জেরে ব্যাংক হিসাব বন্ধ হওয়াসহ নানা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয় তাকে। একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য এমন পরিস্থিতি ছিল বড় ধাক্কা। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাকে ব্যবসার নিয়মকানুন সম্পর্কে আরও সতর্ক করে। অবশেষে ২০২৫ সালে নিজের উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে সঙ্গী করেন আলহাজ্ব, মেহেদী হাসান জুবায়ের ও মুজাহিদুল ইসলামকে। তখন প্রাথমিক মূলধন ছিল পাঁচ লাখ টাকা। এরপর আরও দুই বিনিয়োগকারী মৃম্ময় ও নাসরিনকে এই উদ্যোগে যুক্ত করেন। নাসরিন প্রতিষ্ঠানটিতে ৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। তাদের মূলধন দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকায়। সেই মূলধনই ডেল্টা ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবসার পরবর্তী অধ্যায়ের ভিত্তি। কয়েক মাসের ব্যবধানে েসটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকায়। ব্যবসার পরিধিও ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। খুচরা ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পাইকারি বিক্রেতা— বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে পণ্য নিচ্ছেন।
ডেল্টা ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবসার পরিধি শুধু পণ্য আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়; আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি মেশিনারিজ, মেডিসিন, কসমেটিকস, ইলেকট্রিক ডিভাইসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশীয় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজে যুক্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ঠিকাদারির সুযোগও রয়েছে তাদের সামনে। ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিবন্ধিত এনজিওতে নিবন্ধিত সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে ডেল্টা ব্রাদার্স। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের অনুমোদনও রয়েছে।
চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি থেকেও পণ্য আমদানি করছেন ফাহাদরা। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ডের একক আমদানিকারক হিসেবে কাজ করছেন। চীনের চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশনের বাংলাদেশে একক ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
এই আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বড় একটি অংশ সামলাচ্ছেন আনোয়ার হোসেন রাজু। ডেল্টা ব্রাদার্সের এই কর্মকর্তাও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। চীনে থেকেই তিনি কারখানা পরিদর্শন, পণ্য সংগ্রহ এবং নতুন পণ্যের বাজার যাচাইয়ের কাজ করেন। বাংলাদেশের বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেই তথ্যও তিনি সংগ্রহ করেন। চাহিদা অনুযায়ী পরে পণ্য আমদানি করা হয়। চীনে থাকা আরেক কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার কাজেও সহযোগিতা করছেন। এভাবেই খুলনার একটি ছোট অফিস থেকে পরিচালিত ব্যবসাটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
ডেল্টা ব্রাদার্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মূল অফিসে যুক্ত আছেন তিনজন কর্মী। তাদের পাশাপাশি উদ্যোক্তারাও নিয়মিত অফিস করেন। সপ্তাহে ছয় দিন দাপ্তরিক কার্যক্রম চললেও অনলাইনে সক্রিয়তা সাত দিনই। ব্যবসা থেকে মাসে গড়ে প্রায় তিন লাখ টাকা লাভ হচ্ছে বলে জানালেন উদ্যোক্তারা। তবে এখনো মালিকপক্ষের কেউ লভ্যাংশ হিসেবে সেই অর্থ ভাগ করে নেন না; বরং লাভের বড় অংশ ব্যবসায় আবার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মূলধনকে আরও বড় করাই তাদের লক্ষ্য।
চীনে একটি নিজস্ব অফিস স্থাপন করার পরিকল্পনা করছেন তারা। সেই অফিসকে কেন্দ্র করে চীনের বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে চান। অর্থাৎ খুলনায় শুরু হওয়া ব্যবসাটিকে ফাহাদরা ধীরে ধীরে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চান, যার পণ্য শুধু বাংলাদেশের ৬৪ জেলাতেই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও পৌঁছাবে।






