গ্যাস বিদ্যুতে রেকর্ড ঘাটতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও এখন তা ২৪৩ কোটিতে নেমেছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গড়ে চাহিদা ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি ও অর্থসংকটে উৎপাদন হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট লেগেই আছে।
শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালের শুরুতে দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পরও সংকট দূর হয়নি, উল্টো বেড়েছে। গ্যাসের পাশাপাশি মিলছে না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।
অন্যদিকে গ্যাসের আশায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করে বহু শিল্পোদ্যোক্তা ভুগছেন দিনের পর দিন। বারবার ধরনা দিয়েও মিলছে না গ্যাস-সংযোগ। প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে বিরাট অঙ্কের সুদ।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শিল্পে গ্যাস-সংযোগ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বৈঠক হয়েছে। গ্যাসের অভাবে কারখানাগুলোর দুর্দশা উঠে এসেছে সেখানে। বিদ্যুৎ ও সার কারখানার বাইরে শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংযোগ দেওয়া দরকার বলে মতপ্রকাশ করা হয় বৈঠকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিল্পে গ্যাস-সংযোগের ব্যাপারে কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালনি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা আনতে সময় লাগবে। সরকার সেজন্য কাজ করছে। শিল্পে সংযোগ দেওয়া হলে সবার আগে ডিম্যান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পাবে।
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে ধস নামে। গত বৃহস্পতিবার সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সংকট আরও বেড়ে যায়। শুক্রবার মোট সরবরাহ ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমেছিল। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুটের মতো।
গ্যাসসংকটের প্রভাবে বেড়ে যায় বিদ্যুতের লোডশেডিং। বাসাবাড়ি, কারখানা, সিএনজি স্টেশন— সবখানে দেখা দেয় গ্যাসের হাহাকার। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমন করতে গত মঙ্গলবার শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে বিদ্যুতের লোডশেডিং কমলেও বেশিরভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
তবে টার্মিনাল দুটি সচল হওয়ায় গতকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে দৈনিক প্রায় ২৪৩ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়। এর মধ্যে দেশীয় কূপ থেকে ১৬২ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮১ কোটি ঘনফুট। শিগগির এই সরবরাহ ধীরে ধীরে ১০০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে কারখানায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বেড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন। গতকাল ছুটির দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৭ মেগাওয়াট। গত সপ্তাহে গড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।
বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার থেকে সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার অতিরিক্ত সক্ষমতার পরও নিবরচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে। ফলে ৪০-৫০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসে আছে। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। অন্যদিকে লোডশেডিংও বাড়ছে।
বর্তমানে সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫-১৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৪-১৫ হাজার মেগাওয়াট। গত সপ্তাহে সরবরাহ করা হচ্ছিল ১২-১৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। মূলত গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। এখন সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। তবে গরম বাড়লে চাহিদাও বেড়ে যায়।
নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কথা বলে আওয়ামী লীগ সরকার ১২ টাকার গ্যাস ৩০ টাকা করেছিল। গ্যাস পাওয়ার আশায় কষ্ট হলেও তা মেনে নিয়েছিলাম; কিন্তু গ্যাস পায়নি। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর সংকট আরও প্রকট হয়েছে। কারণ একদিকে গ্যাস নেই, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে গেছে। ব্যাংক ঋণ পরিশোধে জটিলতা বেড়েছে।’
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহ: সরকারি হিসাবে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে চাহিদা আরও বেশি। গত বছরের ৬ জানুয়ারি শিল্পে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে দৈনিক চাহিদা ৫৩৫ কোটি ঘনফুট উল্লেখ করা হয়। এর ৬ মাস পর আগস্টে সার কারখানায় গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে চাহিদা উল্লেখ করা হয় ৫১০ কোটি ঘনফুট। এর বাইরে রয়েছে প্রতিশ্রুত ও অপেক্ষমাণ গ্রাহক। ফলে প্রকৃত চাহিদা কত, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্যমতে, মোট ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ২৫২ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় গড়ে ৮০-১০০ কোটি ঘনফুট। সার কারখানায় প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ১৪-১৮ কোটি ঘনুফট সরবরাহ করা হয়। বাকি গ্যাস দেওয়া হয় অন্যান্য (শিল্প, বাণিজ্য, আবাসিক, সিএনজি ও চা উৎপাদন) খাতে। এই অন্যান্য খাতের চাহিদা আলাদা করে উল্লেখ না করার কারণে কোন খাতে কত চাহিদা, তা বের করা মুশকিল।
তবে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানালেন, কমবেশি ৪১ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হয় বিদ্যুৎ খাতে। সারে ৬, বাসাবাড়িতে ১১, শিল্পে (ক্যাপটিভসহ) ৩৬, সিএনজি খাতে ৫ ও চা খাতে গ্যাস সরবরাহ হয় ১ শতাংশের মতো। চাহিদা বুঝে এক খাত থেকে কমিয়ে অন্য খাতে সরবরাহ বাড়ানো হয়।
এ হিসাবে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা হয় প্রায় ১৪০ কোটি ঘনফুটের মতো। কিন্তু বর্তমানে শিল্পে যে সংযোগ রয়েছে, তাতে চাহিদা অন্তত ১৮০-২০০ কোটি ঘনফুট। গত বুধবার বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে শিল্পে সরবরাহ কমবেশি ৬০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।
ভুগছে নতুন কারখানা: আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গত বছরের এপ্রিলে শিল্পে নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়; কিন্তু মিলছে না নতুন গ্যাস-সংযোগ।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে ১ হাজার ৮০০টির বেশি আবেদন জমা আছে শিল্প সংযোগের জন্য। যার মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক গ্যাস-সংযোগের জন্য নির্ধারিত ডিম্যান্ড নোটের টাকা জমা দেওয়াসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করেছেন; কিন্তু গ্যাস মেলেনি।
ভুক্তভোগী উদ্যোক্তরা বলছেন, গ্যাস পাওয়ার আশ্বাসে তারা বিপুল বিনিয়োগ করে কারখানা তৈরি করেছেন। কিন্তু গ্যাসের অভাবে উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রতি মাসে ঋণের বিপরীতের টানতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সুদ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যথেষ্ট জোর দেওয়া হয়নি; বরং উৎসাহ ছিল আমদানিতে। এ কারণে সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে কারখানার চাকা বন্ধ হচ্ছে। উৎপাদন কমে গেলে শিল্পের আয় কমবে এবং তারা সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করবেন বা দিতে পারবেন না।
এই বিশেষজ্ঞ বললেন, গত দেড়-দুই দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের বিভিন্ন স্তরে যেসব লুণ্ঠন, অন্যায্য ও অসংগত ব্যয় যুক্ত করা হয়েছে, তা অবিলম্বে পর্যালোচনা করে ছেঁটে ফেলতে হবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় গ্যাসের ব্যবহার সীমিত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এলএনজি আমদানি কোনোভাবেই ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের ওপরে বাড়ানো যাবে না। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে। অথচ স্থলভাগে ছয় মাস থেকে দেড় বছরের মধ্যে গ্যাস আবিষ্কার করা সম্ভব; কিন্তু সেটি নিয়ে কোনো কথা নেই। স্থলভাগে অনুসন্ধানে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।






