তিন মাসে ৭১ যৌন হয়রানি নালিশ স্কুলছাত্রীদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে আলোর স্লোগান। সেই আলোয় আলোকিত হতে এবং মানবিকতা, মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার শেখার জন্য যায় ছাত্রছাত্রীরা। তাদের বাবা-মায়ের স্নেহে পাঠদানের বাইরে হিংস্রতাও দেখাচ্ছেন কিছু শিক্ষক। পরিস্থিতি এতটাই প্রকট যে, তিন মাসেই স্কুলগুলোয় উঠেছে ৭১ যৌন হয়রানির অভিযোগ। এটি সারা দেশের চিত্র নয়, শুধু এক-চতুর্থাংশ স্কুলের। সম্প্রতি এ তথ্য প্রকাশ করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। আর নালিশগুলো শনাক্ত করেছে অধিদপ্তরের ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম (ডিএমএস)।
চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাসে দেশের ৫ হাজার ৪৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ডিএমএস। এতে ঘটনাগুলোকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে যৌন হয়রানির ৭১টি অভিযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর কথাও উল্লেখ রয়েছে মাউশির মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক সমন্বিত মনিটরিং প্রতিবেদনে।
তিন মাসে ৯২৬ অভিযোগ: শুধু যৌন হয়রানি নয়, তিন মাসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকে জমা পড়ে ৯২৬টি অভিযোগ। এর মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে ৮৪৫টি। ফলে নতুন অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৯১ দশমিক ২ শতাংশ। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ে ২ হাজার ৩০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসেনি কোনো অভিযোগ। এর অর্থ এই নয় যে, সেখানে কোনো যৌন হয়রানি বা অনিয়ম নেই। অভিযোগ জানানোর পরিবেশ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতা এবং প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থার ওপরও এ ধরনের তথ্য নির্ভর করে।
মনিটরিং প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন সময়ে অধিকাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হলেও আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়েছে ৭১টি। এগুলো যৌন হয়রানি-সংশ্লিষ্ট হওয়ায় দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব।
তদারকিতেই বড় ঘাটতি: যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় নজরদারির প্রয়োজন থাকলেও মাউশির মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এপ্রিল-জুন সময়ে ২০ হাজার ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের পরিকল্পনা থাকলেও সম্পন্ন হয়েছে ৫ হাজার ৪৪৭টি, যা পরিকল্পিত পরিদর্শনের মাত্র ২৭ দশমিক ২১ শতাংশ। এর মধ্যে নির্ধারিত সময়ে পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ। বাকি ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ পরিদর্শনে ছিল বিলম্ব। ফলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি কিংবা অন্যান্য অনিয়ম নিয়মিতভাবে নজরদারির আওতায় আনা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।
নির্দেশনা থাকলেও নেই প্রতিরোধ সেল: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনায় অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো এ ধরনের প্রতিরোধ কমিটি গঠন হয়নি বলে জানিয়েছেন মাউশির কর্মকর্তারা। ফলে অভিযোগ শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল, নিরাপদ অভিযোগ জানানোর পরিবেশ এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবেদনের তথ্য উদ্বেগজনক উল্লেখ করে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বললেন, যৌন হয়রানির এ তথ্য নিঃসন্দেহে ভাবনার বিষয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এখনো কমিটিই করা সম্ভব হয়নি। সারা দেশে যৌন হয়রানির ঘটনা সম্পর্কে তথ্য পেতে এ-সংক্রান্ত একটি সূচক যুক্ত করা হয়েছে মাউশির ডিএমএস অ্যাপে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশিকা দ্রুত অনুমোদনের বিষয়ে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। একই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং বিষয়গুলো।






