ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ড
কোয়ালাদের বাঁচার শেষ ভরসা
- মারাত্মক ক্ল্যামিডিয়ার থাবায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালারা
- কোয়ালাদের একমাত্র আশ্রয় এখন ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ড
- ভয়াবহ দাবানলে ভেঙে পড়ে কোয়ালাদের নিরাপদ আবাসন

মৃদু বাতাসে দুলছে ইউক্যালিপটাস গাছের পাতা। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এক নীরব সকালে, গাছের ডালে নিশ্চিন্তে বসে আছে একটি মাদি কোয়ালা। নিচে দাঁড়িয়ে কয়েকজন গবেষক। তাদের হাতে লম্বা দণ্ড, চোখে গভীর মনোযোগ। ধীরে ধীরে তাকে (কোয়ালা) নিচে নামানোর চেষ্টা চলছে। প্রথমে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। কোয়ালাটি গাছ বেয়ে নেমে আসে, মাটিতে লাফ দেয়, গর্জন তোলে, তারপর আত্মরক্ষায় নখ মেলে ধরে। অভিজ্ঞ হাতে গবেষকেরা তাকে সাবধানে ধরে ফেলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে হালকা অচেতন করে পরীক্ষা শুরু হয়।
‘আমার মনে হচ্ছে, ওর ক্ল্যামিডিয়া হয়েছে’— বলেছেন সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী ক্যারেন বার্ক ডা সিলভা।
এই একটি বাক্য যেন পুরো অস্ট্রেলিয়ার কোয়ালাদের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। একসময় যাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর, সেই কোয়ালারাই এখন ধীরে ধীরে যাচ্ছে হারিয়ে। প্রধান কারণ—একটি ব্যাকটেরিয়া, Chlamydia pecorum। এই সংক্রমণ অন্ধত্ব, বন্ধ্যাত্ব এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনে। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে কোথাও কোথাও প্রায় ৮৮ শতাংশ কোয়ালা এই রোগে আক্রান্ত। তবে আশার একটি জায়গা এখনও টিকে আছে ‘ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ড’।
অস্ট্রেলিয়ার উপকূল থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ যেন কোয়ালাদের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয়। এখানে এখনও ক্ল্যামিডিয়া ছড়ায়নি। তাই অনেকেই একে বলেছেন, ‘কোয়ালাদের ‘শেষ ভরসা’। কিন্তু এই নিরাপত্তার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি গভীর সংকট।
প্রায় একশ বছর আগে মাত্র ২০টি কোয়ালা এনে এই দ্বীপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ছোট দল থেকেই আজকের পুরো জনসংখ্যা। একসময় সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজারে। কিন্তু একই রক্তের মধ্যে বারবার প্রজননের ফলে তাদের জিনগত বৈচিত্র্য ভয়াবহভাবে কমে গেছে।
গবেষক জুলিয়ান বিম্যান বলেছেন, ‘একটি ছোট ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীতে ধীরে ধীরে দুর্বলতা বাড়ে। এটা যেন হাজার ক্ষতের মতো। একসঙ্গে না হলেও, শেষ পর্যন্ত মারাত্মক হয়ে ওঠে।’
এই আশঙ্কা আরও বাস্তব হয়ে ওঠে ২০১৯-২০ সালের ভয়াবহ দাবানলে। ‘ব্ল্যাক সামার’ নামে পরিচিত সেই আগুন, ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। প্রায় ৮০ শতাংশ কোয়ালা মারা যায়। সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১০ হাজারে।
যারা বেঁচে ছিল, তারা আশ্রয় নেয় কাছাকাছি নীলগাছের বাগানে। কিন্তু সেখানেও বিপদ অপেক্ষা করছিল। কিছুদিন পরই সেই বনভূমি কেটে ফেলা শুরু হয় কৃষিকাজের জন্য। খাদ্য ও আশ্রয় হারিয়ে অনেক কোয়ালা তখন অনাহার আর আঘাতে মারা যায়।
‘এটা ছিল ভয়ংকর অভিজ্ঞতা’— বলেছেন ডা সিলভা।
এই সংকটের মধ্যেই জন্ম নেয় নতুন উদ্যোগ—‘দ্য কোয়ালা স্যাংচুয়ারি’। গবেষকরা মিলে একটি বড় এলাকা কিনে সেখানে কোয়ালাদের জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করেন। প্রায় এক হাজার কোয়ালা এখন সেখানে সুরক্ষিত।
২০২৬ সালে এটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। যাতে সংরক্ষণ কাজের জন্য অর্থ পাওয়া যায়। তবে শুধু নিরাপদ জায়গা দিলেই হবে না, বাঁচাতে হলে দরকার শক্তিশালী ভবিষ্যৎ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই দ্বীপের কোয়ালাদের জিনগত বৈচিত্র্য খুবই কম। অনেকের শরীরে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা একে বলেছেন ‘এক্সটিঙ্কশন ভর্টেক্স’। একটি বিপজ্জনক চক্র, যেখানে দুর্বলতা আরও দুর্বলতাকে জন্ম দেয়।
এই অবস্থা থেকে বের হতে গবেষকরা নিয়েছেন নতুন পরিকল্পনা—‘জেনেটিক রেসকিউ’।
মূল ভূখণ্ড থেকে সুস্থ, জিনগতভাবে বৈচিত্র্যময় কোয়ালা এনে দ্বীপের কোয়ালাদের সঙ্গে প্রজনন করানো হবে। এতে তৈরি হবে নতুন প্রজন্ম। যারা হবে রোগমুক্ত এবং জিনগতভাবে শক্তিশালী।
এরপর সেই নতুন কোয়ালাদের আবার অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। বিশেষ করে যেখানে এখনও রোগের প্রভাব কম।
২০২৭ সালের মধ্যেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করার আশা করছেন গবেষকরা। এই পুরো উদ্যোগ শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানোর গল্প নয়। এটি মানুষের দায়বদ্ধতার গল্পও। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলার পর, আবার সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার এক প্রচেষ্টা।
ডা সিলভা বলেছেন, ‘শুধু প্রকৃতিকে সুস্থ করা নয়, আমাদেরও বুঝতে হবে, প্রকৃতি কীভাবে আমাদের সুস্থ করে।’
ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডের কোয়ালারা তাই শুধু একটি প্রজাতির সংগ্রাম নয়, এটি ভবিষ্যৎ রক্ষার এক দীর্ঘ লড়াই, যেখানে এখনো আশার আলো জ্বলছে।
কিন্তু সামনে পথটা মোটেও সহজ নয়। কোয়ালাদের বাঁচাতে নতুন ভ্যাকসিন আশার আলো দেখালেও বন্য পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কোয়ালাকে টিকা দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি দ্রুত কমে যাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাস। বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ আর নগরায়নের কারণে কোয়ালারা এখন ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলে আটকে পড়ছে; যা তাদের জিনগত দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাড়তি তাপমাত্রা আর দীর্ঘ খরার ফলে ইউক্যালিপটাস পাতার পুষ্টিগুণ কমে যাচ্ছে; যা কোয়ালাদের খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাই গবেষকদের মতে, শুধু একটি উদ্যোগে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। রোগ নিয়ন্ত্রণ, বন সংরক্ষণ এবং জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানো সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলেই হয়তো কোয়ালাদের জন্য টিকে থাকার নতুন পথ তৈরি হবে।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি


