যেখানে শত তিমির নিঃশ্বাসে জেগে ওঠে সমুদ্র
- বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরে শত শত হাম্ব্যাক তিমির অভূতপূর্ব সমাবেশ
- বিশৃঙ্খলার মাঝেও লুকিয়ে আছে পুনর্জাগরণের গল্প

বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরে সমুদ্রে বাড়ছে হাম্ব্যাক তিমির সংখ্যা। ছবি: ক্রিস ফ্যালোস
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এক কুয়াশা ভেজা ভোর। দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের সমুদ্র তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ঢেউয়ের মৃদু ওঠানামা আর হালকা বাতাস সব মিলিয়ে শান্ত এক সকাল। সেই নীরবতার মাঝেই ছোট একটি নৌকায় অপেক্ষা করছিলেন দুই আলোকচিত্রী—মনিকে ফ্যালোস ও ক্রিস ফ্যালোস।
তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, সমুদ্রে নাকি জড়ো হচ্ছে অসংখ্য হাম্ব্যাক তিমি। খবরটা যদি সত্যি হয়, তবে সামনে অপেক্ষা করছে বিরল এক দৃশ্য। সেই আশাতেই সূর্য ওঠার আগেই, ভোরে তারা নৌকা নিয়ে পাড়ি জমান সমুদ্রের দিকে।
নৌকার ইঞ্জিন বারবার বন্ধ করে তারা ভেসে থাকছিলেন। মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন চারপাশ। হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসে এক তীব্র শব্দ; যেন বিশাল কিছু পানিতে আছড়ে পড়ছে।
দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন ম্যানহাটনের আকাশচুম্বী ভবনের সারি। তিমিদের শ্বাসের ফোয়ারাগুলো ঠিক সেভাবেই উঠে যাচ্ছে আকাশে
ক্রিস বলেছিলেন, ‘তিমিরা যখন লাফিয়ে উঠে আবার পানিতে পড়ে, শব্দটা যেন বোমা বিস্ফোরণের মতো শোনায়। দূর থেকেই সেটা বোঝা যায়।’
তারা দুজন ধীরে ধীরে সেই শব্দের দিকে এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই বাতাসে ভেসে আসে তীব্র এক গন্ধ। মাছের মতো, কাঁচা সমুদ্রের মতো।
মনিকে বলেছেন, ‘তিমিদের নিঃশ্বাস যেন এসে গায়ে লাগে। প্রথমে গন্ধটা পেয়ে মনে হয়, এটা কী! এরপরই সামনে খুলে যায় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। চারপাশে তিমি—একটা, দুটো নয়, শত শত। কেউ ডুব দিচ্ছে, কেউ ভেসে উঠছে, কেউ লাফিয়ে উঠে আবার পানিতে আছড়ে পড়ছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু তিমি আর তিমি।’
মনিকে এই দৃশ্যকে তুলনা করেন শহরের সঙ্গে। ‘দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন ম্যানহাটনের আকাশচুম্বী ভবনের সারি। তিমিদের শ্বাসের ফোয়ারাগুলো ঠিক সেভাবেই উঠে যাচ্ছে আকাশে।’
‘হাম্ব্যাক তিমি যখন শ্বাস ছাড়ে, সেই বাতাস প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার গতিতে বেরিয়ে যায় এবং সাত মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে। শব্দটা যেন বড় এক ধোঁয়াধারার মতো।— যোগ করেন মনিকে
আর গন্ধ, খুব তীব্র, একেবারে মাছের মতো বলে জানান মনিকে।
আমরা রেকর্ড ভাঙার জন্য বের হইনি। কিন্তু চারপাশে এত তিমি ছিল যে কী ছবি তুলব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। সবকিছু যেন একসঙ্গে ঘটছিল। একেবারে বিশৃঙ্খল, কিন্তু অবিশ্বাস্য সুন্দর
এই দুই দিনে মনিকে ও ক্রিস যা দেখলেন, তা শুধু বিরল নয়—ঐতিহাসিকও। ২৯ ডিসেম্বর তারা ২০৮টি তিমি শনাক্ত করেন। পরের দিন সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০৪-এ। পৃথিবীর ইতিহাসে এক দিনে এত বড় তিমি আগে কখনো একসঙ্গে শনাক্ত হয়নি। সব মিলিয়ে তাদের তোলা ছবিতে শনাক্ত হয় ৩৭২টি আলাদা তিমি।
ক্রিস বলেছেন, ‘আমরা রেকর্ড ভাঙার জন্য বের হইনি। কিন্তু চারপাশে এত তিমি ছিল যে কী ছবি তুলব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। সবকিছু যেন একসঙ্গে ঘটছিল। একেবারে বিশৃঙ্খল, কিন্তু অবিশ্বাস্য সুন্দর।’
এই বিশাল সমাবেশকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘সুপারগ্রুপ’। যেখানে ২০টির বেশি তিমি খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন দৃশ্য দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে সুপার গ্রুপ দেখার সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ৬৫-এ পৌঁছেছে।
একসময় যেখানে একটি তিমি দেখাই ছিল বিরল ঘটনা। এখন সেখানে শত শত তিমি দেখা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
গবেষক সাইমন এলউইনের ভাষায়, আগে একটি বা দুটি তিমি দেখলেই আমরা উচ্ছ্বসিত হতাম। এখন একা তিমি দেখা বরং অস্বাভাবিক।
কেন এমন হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট উত্তর এখনো নেই। তবে ধারণা করা হয়, গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসা পুষ্টিসমৃদ্ধ ঠান্ডা পানির কারণে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বাড়ে, তার সঙ্গে বাড়ে ক্রিল; যা হাম্ব্যাক তিমির প্রধান খাদ্য। খাবার যখন এত বেশি, তখন শত শত তিমি এক জায়গায় ভিড় করে। তবে এই দৃশ্য বাইরে থেকে যতটা বিশৃঙ্খল মনে হয়, ভেতরে ততটা নয়।
ক্রিস জানান, আমরা যখন কাছাকাছি গেলাম, তখন শতাধিক তিমির শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর একে একে চোখে পড়ল তাদের পাখনা, লেজ, শরীর সবকিছু। মনে হচ্ছিল বিশৃঙ্খলা, কিন্তু তারা জানে তারা কী করছে।
গবেষকদের মতে, এই আচরণ আসলে ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’। সাধারণত হাম্ব্যাক তিমি দলবদ্ধভাবে অত্যন্ত কৌশলী পদ্ধতিতে শিকার করে। যেমন: ‘বাবল নেট ফিডিং’, যেখানে তারা বুদবুদ দিয়ে মাছকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু সুপার গ্রুপে এত বেশি খাদ্য থাকে যে তারা একসঙ্গে, দ্রুত এবং কখনো বিশৃঙ্খলভাবে খাবার সংগ্রহ করে।
এক গবেষকের ভাষায়, ভাবুন শত শত ১০ টনের বাচ্চা একসঙ্গে খাবার খুঁজছে। পুরো দৃশ্যটাই যেন পাগলাটে।’
এই বিশাল সমাবেশে তরুণ তিমির সংখ্যা বেশি। অনেকের বয়স ১০ বছরের নিচে, এমনকি পাঁচ বছরেরও কম। অর্থাৎ নতুন প্রজন্ম দ্রুত বাড়ছে। এই দৃশ্য তাই শুধু বিস্ময়ের নয়, আশারও।
একসময় শিল্পভিত্তিক তিমি শিকার হাম্ব্যাকদের প্রায় বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। তাদের সংখ্যা নেমে গিয়েছিল আগের তুলনায় ৫ শতাংশেরও নিচে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে তিমি শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার পর ধীরে ধীরে তারা ফিরে আসতে শুরু করে।
এটা এক ধরনের সম্পূর্ণ সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা, শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য সব একসঙ্গে। আপনি বুঝতেই পারবেন না, কোথায় তাকাবেন
আজ দক্ষিণ গোলার্ধে তাদের সংখ্যা বছরে প্রায় ১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই দ্রুত বৃদ্ধি অনেকটা ভাইরাসের বিস্তারের মতো—প্রথমে ধীর, তারপর হঠাৎ দ্রুত।
হাম্ব্যাক তিমি পৃথিবীর দীর্ঘতম অভিবাসী প্রাণীদের মধ্যে একটি। তারা বছরে প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করে, উষ্ণ প্রজনন এলাকা থেকে ঠান্ডা খাদ্যসমৃদ্ধ অঞ্চলে। এই যাত্রায় তারা সমুদ্রজুড়ে পুষ্টি ছড়িয়ে দেয়, যা সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখছে ‘হ্যাপিওয়েল’ নামের একটি প্রকল্প। এখানে সাধারণ মানুষও তিমির লেজের ছবি আপলোড করতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি তিমিকে আলাদা করে শনাক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত এই ডাটাবেজে প্রায় ১৫ লাখ ছবি জমা হয়েছে।
তবে সবকিছু এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। হাম্ব্যাক তিমি এখনো নানা হুমকির মুখে। মাছ ধরার জালে আটকা পড়া, জাহাজের ধাক্কা, সমুদ্রের শব্দ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্যচক্রের পরিবর্তন। তারপরও, সেই ডিসেম্বরের সকালে সমুদ্র যেন অন্য গল্প বলছিল।
মনিকে ও ক্রিসের নৌকার চারপাশে শত শত তিমি শ্বাস নিচ্ছে, উঠছে এবং ডুব দিচ্ছে। বাতাসে তাদের নিঃশ্বাস, পানিতে তাদের ছায়া সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
মনিকে বলেছেন, ‘এটা এক ধরনের সম্পূর্ণ সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা, শব্দ, গন্ধ, দৃশ্য সব একসঙ্গে। আপনি বুঝতেই পারবেন না, কোথায় তাকাবেন।’
দিন শেষে তারা বুঝেছিলেন, তারা শুধু ছবি তুলেননি, একটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছেন। একসময় যে প্রজাতি মানুষের হাতেই প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল, আজ তারা আবার সমুদ্রে ফিরে এসেছে। শত শত, হাজার হাজার।
আর সেই সমুদ্র, যেখানে একসময় নীরবতা ছিল। আজ সেখানে শত তিমির নিঃশ্বাসে সত্যিই জেগে উঠছে এক নতুন জীবন।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি




