ওএসডিতে তারা দারুণ খুশি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরিতে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শাস্তিমূলক পদায়ন। ব্যঙ্গ করে অনেকে ‘বারান্দা স্পেশালিস্ট’ বা ‘পেইড হলিডে’ বলে ডাকেন। সরকারের যেকোনো চাকরিতে ওএসডি ‘শাস্তিমূলক’ হলেও শিক্ষা ক্যাডারে তা আশীর্বাদ। এখানে নিজ থেকে ওএসডি হতে চান অনেকেই। তদবির ও নানা তৎপরতায় পদায়ন নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ব্যস্ত সময় কাটান ব্যক্তিগত কাজে। প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করেই কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লেনদেন হয় মোটা অঙ্কের অর্থ— এমন অভিযোগও আছে। এ মুহূর্তে ওএসডিতে থাকা ৩ হাজার ৩৫০ জনের সিংহভাগই বসে বসে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছেন। অথচ তাদের পেছনে বছরে সরকারের ব্যয় ২৬৮ কোটি টাকা। পুরোটাই গচ্চা যাচ্ছে— এমন মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
আগামীর সময়ের নিজস্ব অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। আরও জানা গেছে, শিক্ষা ক্যাডারে ১৬ হাজার শিক্ষক-কর্মকর্তা আছেন। এর মধ্যে ঢাকার বাইরে ওএসডি ২ হাজার ২১০ জন। তবে এ বিষয়টি ঢাকায় ওএসডি হওয়ার মতো নয়। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। পদ শূন্য হলেই পদায়ন হবে। এদিকে উল্লিখিত ৩ হাজার ৩৫০ জন শিক্ষক রাজধানীর ২৩টি কলেজে ওএসডি। তাদের বেতন হয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে। কলেজে দিনের পর দিন অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা তুলছেন দিব্যি। তারা বিভাগে অতিরিক্ত শিক্ষক হওয়ায় মাসে একটি ক্লাস জোটে না— এমন নজিরও আছে। তবে মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, রাজধানীর কলেজগুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত অনেক বেশি। কিন্তু সেভাবে পদ সৃষ্টি হয়নি। পদ শূন্য না থাকায় পদায়নের একমাত্র উপায় ওএসডি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওএসডির নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালীদের তদবির, ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ-বাণিজ্য। একবার ওএসডি হয়ে ঢাকায় ঢুকছেন, এরপর ২০ বছর কেটেছে— এমন শিক্ষকেরও সন্ধান মিলেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ঢাকার উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ছয়টি কলেজে। এসব কলেজ আওয়ামী লীগ মতাদর্শপুষ্ট, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নফাঁস, জিপিএ ৫ বিক্রি কিংবা বোর্ডের খাতা ট্যাম্পারিং করা কর্মকর্তাদের ডাম্পিং স্টেশন। তাদের সরাতে কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও পিছু হটেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পদবিহীন এসব পদায়নের পেছনে এমপি-মন্ত্রীদেরও ডিও লেটার (আধা সরকারিপত্র) রয়েছে। তদবির, ঘুষ কিংবা স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থলের দোহাই দিয়ে যারা রাজধানীতে ওএসডি হয়েছেন, তারা মফস্বল কলেজে যেতে চান না।
শিক্ষা ক্যাডারে এমন ওএসডি অবশ্যই অস্বাভাবিক— এমনটি মনে করছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া। তার মতে, পদের বাইরে হাজার হাজার কর্মকর্তা ওএসডি মানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। এই ডাম্পিং কালচার বন্ধ করতে হলে বদলি ও পদায়নে আমলাতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
ওএসডির তথ্য বিশ্লেষণে অধ্যাপক পদে ওএসডি আছেন ৫৪০ ও সহযোগী অধ্যাপক ৫৭২ জন। ওএসডির শীর্ষে আছেন সহকারী অধ্যাপকরা। যাদের সংখ্যা ১ হাজার ১১৯ জন। প্রভাষক পদটি এন্ট্রি লেভেলের পদ হওয়ায় ওএসডি মাত্র ৫০টি। কলেজগুলোর পদের পরিসংখ্যান বলছে, ৭৮ শতাংশ শিক্ষক নিয়মিত পদের বাইরে ভিন্ন ব্যবস্থায় ঢাকায় বসে আছেন।
নাম প্রকাশ না করে ঢাকার কয়েকটি বড় কলেজের অধ্যক্ষ প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে বলছেন, ওএসডি হয়ে আসা শিক্ষকরা থাকেন জবাবদিহির বাইরে। অধিদপ্তর থেকে বেতন এবং এসিআর হওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষকে পাত্তা দিতে চান না প্রভাবশালী এসব শিক্ষক। ফলে মাসে একটি ক্লাসও নেন না— এমন শিক্ষকও রয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, তেমনি শিক্ষা কার্যক্রমে তৈরি হচ্ছে ভারসাম্যহীনতা— এমনটিই মনে করছেন মাউশির কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হক। তিনি আগামীর সময়কে বলেছেন, বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব। প্রয়োজনে মফস্বলে পদায়ন করে হলেও এই পরিস্থিতির সুরাহা হওয়া উচিত।
বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে সাফ জানিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক আগামীর সময়কে বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দোহাই দিয়ে যারা ওএসডি হয়ে আছেন, তাদের তথ্য সংগ্রহ করব। এ ছাড়া যারা ‘ডাম্পিং পোস্টিং’ হিসেবে ঢাকার কলেজগুলোকে ওএসডি কলেজ বানিয়েছেন, তাদের সরানো হবে।
সাত কলেজেই বাড়তি শিক্ষক ৬২৮ জন
রাজধানীর সাতটি কলেজকে বলা হয় ওএসডির আঁতুড়ঘর। প্রভাবশালী আমলা, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা কিংবা মোটা অঙ্কে ঘুষ যে ফরম্যাটেই হোক, সবাই চায় সাত কলেজে পদায়ন। ঢাকা কলেজ, ইডেন, তিতুমীর, সোহরাওয়ার্দী, বেগম বদরুন্নেসা, সরকারি বাঙলা ও কবি নজরুল কলেজে অনুমোদিত ৮০২টি পদে শিক্ষক থাকার পরও ওএসডিতে আছেন আরও ৬২৮ জন। এর মধ্যে ২৮৯ জন সংযুক্ত এবং ২৩৯ জন ইনসিটু (পদোন্নতি পেয়েও আগের পদে কর্মরত) ওএসডি।
ওএসডির শীর্ষে ইডেন মহিলা কলেজ। কলেজটিতে মোট ২৭৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৫৪ জনই ওএসডি। প্রভাবশালী আমলা কিংবা পুলিশের স্ত্রীদের ডাম্পিং স্টেশন কলেজটিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ‘বেগম কলেজ’ নামে ডাকেন। এই কলেজের ওএসডি শিক্ষকদের সংখ্যা অনেক জেলা শহরেও নেই— এমনটাই জানালেন একজন যুগ্ম সচিব। ইডেনের পর ঢাকা কলেজে ওএসডি ১৪২ জন। ১৩২ জন আছেন সরকারি বাঙলা কলেজে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ৮২ এবং তিতুমীর কলেজে ৮০ জন। বিষয়ভিত্তিক ওএসডির তথ্যও রীতিমতো বিস্ময়কর। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ৭৮ জন, ভূগোলের মতো বিষয়ে ওএসডি ৫৬ এবং সমাজকল্যাণ ও সমাজকর্ম বিভাগে ৪৪ জন।
৬৩ পদের বিপরীতে ওএসডি ২ হাজার ৪৩৩ জন
সাত কলেজ বাদে অন্য ১৬টি কলেজের মধ্যে ছয়টিতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন হয় বেশি। সবুজবাগ, মোহাম্মদপুর কলেজ, ঢাকা উদ্যান, ভাসানটেক, দুয়ারীপাড়া ও উত্তরা সরকারি কলেজকে শিক্ষা ক্যাডারে অপরাধীদের ডাম্পিং স্টেশন বলা হয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ; তাই পদায়নে ঝুঁকি কম, সেজন্য মন খুলে ঘুষ লেনদেন হয়। এই ছয় কলেজে ৬৩টি পদের বিপরীতে ওএসডি ২ হাজার ৪৩৩ জন। সবুজবাগ কলেজটি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে। এখানে ১৩টি পদের বিপরীতে আছেন ৭৯ জন। ৬৬ জনই ওএসডি। ব্যাংকপাড়ার বেগমদের পোস্টিংয়ের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এই কলেজ। উত্তরা কলেজে ১৩ পদের বিপরীতে আছেন ৭০ জন, যার মধ্যে ৪৭ জনই ওএসডি। মজার বিষয় হলো, কলেজটিতে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পদ না থাকলেও ৩৯ জন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক ওএসডি হয়ে আছেন। বাকি ৪৭ জন অন্যান্য পদে ওএসডি। মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে ১০ পদের বিপরীতে আছেন ৭১ জন, যার মধ্যে ৬১ জনই ওএসডি। ঢাকা উদ্যান কলেজে ১৩ পদের বিপরীতে শিক্ষক ৫৯ জন। এখানে ৭৬ শতাংশই ওএসডি। ভাসানটেক সরকারি মহাবিদ্যালয়ের ৯টি পদের বিপরীতে আছেন ৬৮ জন, যার ৫৯ জনই ওএসডি। দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজটিতে পাঁচটি পদের বিপরীতে ৬৬ জন।
অপরাধীদের সেফ হাউজ ৬ কলেজ
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা সরকারি উদ্যান কলেজ। কাগজে-কলমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ আর অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অঘোষিত ডাম্পিং স্টেশন। অতীতে নানা অপরাধে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার খোঁজ মিলেছে কলেজটিতে। যাদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে বোর্ডের খাতা জালিয়াতি, জিপিএ ৫ বিক্রি, প্রশ্নফাঁস দুর্নীতির মতো অভিযোগ প্রমাণিত। এমন একজন অদ্বৈত কুমার রায়। ১৮তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার মাউশিতে পদায়নের ডানা মেলে ২০১০ সালে। ২০১৩ সালে বাগিয়ে নেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পদ। চেয়ারে বসেই ৫ থেকে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি করেন জিপিএ ৫। সংবাদমাধ্যমে জিপিএ ৫ বিক্রিতে তার নাম আসায় ২০১৮ সালে অদ্বৈতকে বোর্ড থেকে সরানো হয়। এরপর বিভিন্ন কলেজ হয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বদলি হয়ে আসেন ঢাকা উদ্যান কলেজে।
নিজের সন্তানকে এসএসসির খাতা ট্যাম্পারিং করে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর ঢাকা বোর্ড থেকে সরানো হয় ১৬তম বিসিএসের আলোচিত কর্মকর্তা মাসুদা বেগমকে। কুমিল্লাসহ নানা কলেজ ঘুরে ২০২৩ সাল থেকে তিনিও ঘাঁটি গেড়েছেন কলেজটিতে। ২৪তম বিসিএসের ড. এনামুল হক ঘুষের হাট পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে (ডিআইএ) ছিলেন ১৩ বছর। অডিটের নামে যশোরের একটি স্কুল থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার দায়ে ২০১৮ সালে তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। শরীয়তপুর কলেজ থেকে ঢাকা উদ্যান কলেজে বাসা বেঁধেছেন ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে। মোহাম্মদপুরের বসিলায় অবৈধ টাকায় দুই বাড়ি, প্লট ব্যবসা, বেসরকারি কলেজের মালিকানা, মাদারীপুরে মার্কেটে দোকানসহ অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। শুধু তাই নয়, নিজের স্ত্রীকে ২ কোটি টাকা খরচ করে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করান ড. এনামুল। ২৮তম বিসিএসের কর্মকর্তা লাইলুন নাহার মাউশিতে ছিলেন টানা ১৮ বছর। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় মাউশি থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর ওএসডি হয়েছেন হাজারীবাগ কলেজে। উত্তরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. কুদ্দস সিকদার আওয়ামীপন্থী হিসেবে দীর্ঘ সময় ঢাকা কলেজে ছিলেন। ২৮তম বিসিএসে প্রলয় দাস ডিআইএ পরিদর্শক থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে সরানো হলেও এখন তিনি ওএসডি উত্তরা কলেজে। এমন আরও ১৬৫ জন কর্মকর্তা আছেন এই ছয় কলেজে, যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে, তদন্তও হচ্ছে।




