যেখানে সমুদ্রের নিচে অপেক্ষা করছে আরেক পৃথিবী

সংগৃহীত ছবি
আন্দামানের সমুদ্র মানেই নীল জল, শান্ত সৈকত আর দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য। কিন্তু সেই সৌন্দর্যেরও একটা অদেখা দিক আছে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা আরেক পৃথিবী। এতদিন সেই রহস্যময় জগতের গল্প শোনা যেত মূলত আন্দামানের দক্ষিণাঞ্চলের জনপ্রিয় দ্বীপগুলো ঘিরে। এবার সেই গল্পে নতুন নাম যোগ হলো—‘ডিগলিপুর’।
উত্তর আন্দামানের এই শান্ত জনপদ এতদিন পরিচিত ছিল নির্জন সৈকত, ঘন জঙ্গল আর প্রকৃতির কাঁচা সৌন্দর্যের জন্য। তবে এবার সমুদ্রের নিচের বিস্ময় নিয়েও আলোচনায় উঠে এসেছে জায়গাটি। আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসন সম্প্রতি এখানে নতুন চারটি স্কুবা ডাইভিং স্পট চালুর ঘোষণা দিয়েছে। আর তাতেই যেন খুলে গেছে এক নতুন জগতের দরজা।
ডিগলিপুর পোর্ট ব্লেয়ার থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেখানে পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে অন্যরকম এক শান্তি। শহরের কোলাহল নেই, পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় নেই, আছে শুধু সমুদ্রের শব্দ আর প্রকৃতির নীরবতা।
এতদিন স্কুবা ডাইভিংপ্রেমীদের বেশিরভাগই ছুটে যেতেন স্বরাজ দ্বীপ বা শহীদ দ্বীপে। কিন্তু ডিগলিপুর যেন এতদিন চুপচাপ নিজের সৌন্দর্য লুকিয়ে রেখেছিল। এবার সেই লুকানো সৌন্দর্যকে সামনে আনতেই চালু হয়েছে চারটি নতুন ডাইভিং স্পট।
এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাগুলোর একটি রস অ্যান্ড স্মিথ দ্বীপপুঞ্জের উপকূলের কাছে। এখানে নৌকায় উঠতে হয় না। সৈকত থেকে কয়েক পা এগোলেই শুরু হয়ে যায় অন্য এক পৃথিবী। স্বচ্ছ জলের নিচে দেখা মেলে রঙিন প্রবাল, ছোট ছোট মাছ আর দুলতে থাকা সামুদ্রিক উদ্ভিদের।
যারা প্রথমবার ডাইভিং করতে চান, তাদের জন্য জায়গাটি আদর্শ। মাত্র ২ থেকে ১২ মিটার গভীরতার এই এলাকায় পানির নিচের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। অনেকেই এখানে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি করছেন, কেউ আবার প্রথমবারের মতো সমুদ্রের নিচে শ্বাস নেওয়ার অভিজ্ঞতা উপভোগ করছেন।
আরেকটি ডাইভিং স্পট ‘ডিপ ব্লু ব্রিজ’। এখানে নেমে মনে হয় যেন সমুদ্র ধীরে ধীরে আরও গভীর কোনো গল্পের দিকে টেনে নিচ্ছে। প্রবালের বিশাল স্তর, রঙিন অ্যানিমোন আর নীল জলের ভেতর ছুটে চলা মাছ— সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন জীবন্ত কোনো সামুদ্রিক ক্যানভাস।
তবে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা মেলে ‘স্মল ওয়াল অব রস আইল্যান্ড’-এ। এখানে সমুদ্রের নিচে রয়েছে বিশাল খাড়া দেয়ালের মতো গঠন। ৮ থেকে ১০ মিটার গভীরতা থেকে শুরু হয়ে সেটি নেমে গেছে ২১ মিটার নিচে। ডুবুরিরা যখন সেই দেয়ালের পাশ দিয়ে ভেসে যান, তখন চারপাশের নীল অন্ধকার আর বিশাল জলরাশি মিলিয়ে তৈরি হয় এক রহস্যময় অনুভূতি।
আর যারা আরও গভীরের রহস্য খুঁজতে চান, তাদের জন্য রয়েছে ‘ওয়াল অব ক্র্যাগি/জেন্টল স্লোপ’। এই জায়গার গভীরতা ৩১ মিটার পর্যন্ত। এখানে কখনো দেখা মিলতে পারে ম্যান্টা রে কিংবা ঈগল রে’র মতো বিশাল সামুদ্রিক প্রাণীর। ভাগ্য ভালো হলে দেখা যেতে পারে ডুগংও—আন্দামানের বিরল সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী।
নতুন এই উদ্যোগ শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, স্থানীয় মানুষদের জীবনেও বদল আনতে পারে। এতদিন আন্দামানের পর্যটনের বেশিরভাগ সুবিধা দক্ষিণাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ডিগলিপুর, কালিপুর ও এরিয়াল বে এলাকার মানুষও পর্যটন অর্থনীতির অংশ হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় ডিগলিপুরের সৈকতে দাঁড়ালে সমুদ্রটাকে আরও রহস্যময় মনে হয়। দূরে ছোট ছোট ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ে, আর আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কমলা-নীল আলো। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, আন্দামানের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করারও।
সমুদ্রের ওপরে যেমন শান্তি, তেমনি নিচে লুকিয়ে আছে জীবন্ত এক জগৎ— প্রবাল, রঙিন মাছ আর অচেনা সামুদ্রিক প্রাণীর ভুবন। হয়তো এ কারণেই ডিগলিপুর এখন শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং প্রকৃতিপ্রেমী আর অভিযাত্রীদের কাছে নতুন এক স্বপ্নের নাম হয়ে উঠছে।









