আরও ভয়ংকর বর্ষার মুখোমুখি কক্সবাজার
- এক সপ্তাহে ৬৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত
- এ পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু

টানা কয়েক দিনের বর্ষণ আবারও সামনে এনেছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র
টানা সাত দিনের ভারী বর্ষণে যেন পানির নিচে তলিয়ে গেছে কক্সবাজার। কোথাও পাহাড় ধসে প্রাণহানি, কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি, কোথাও আবার পাহাড়ি ঢলে বিচ্ছিন্ন জনপদ।
আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করছেন, এটি সাময়িক দুর্যোগ নয়। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে কক্সবাজার এখন আরও ভয়ংকর বর্ষার মুখোমুখি।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত শনি থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলায় মোট ৬৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে শনিবার ২৮ মিলিমিটার, রবিবার ২৪০ মিলিমিটার, সোমবার ১২৯ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার, বুধবার ১২৫ মিলিমিটার এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
টানা এই বর্ষণে উখিয়া, কক্সবাজার সদর ও পেকুয়া পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেছেন, শনি থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। আকাশে এখনো মেঘের উপস্থিতি আছে। আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখতে বলা হয়েছে।
চলতি জুলাইয়ে টানা কয়েক দিনের বর্ষণ আবারও সামনে এনেছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
পাহাড়ধস, নৌকাডুবি, পানিতে ডুবে মৃত্যু ও দেয়াল ধসসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই মারা গেছেন ১৫ জন। তাদের ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে পাহাড়ধসে।
এছাড়া কক্সবাজার সদর, চকরিয়া ও পেকুয়ায় পাহাড়ধসে প্রাণ গেছে আরও পাঁচজনের। মহেশখালী, রামু ও চকরিয়ায় পানিতে ডুবে মারা গেছেন আরও পাঁচজন। উখিয়ায় ঘরের দেয়াল ধসে মারা গেছেন একজন।
আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামালের ভাষ্য, ‘শুধু বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নয়, বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অতিভারী বর্ষণ এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন উজাড়, পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পাহাড়ের প্রাকৃতিক ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া। ফলে আগের তুলনায় একই পরিমাণ বৃষ্টিতেই কয়েক গুণ বেশি ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।’
গত এক দশকের আবহাওয়ার তথ্যও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এক দিনে রেকর্ড ৫০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ওই সময় জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা জলমগ্ন হয় এবং পাহাড়ধসে ছয়জনের মৃত্যু ঘটে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ের প্রথম সাত দিনেই রেকর্ড হয়েছিল প্রায় ৬৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। সে সময় জেলার ৮০টিরও বেশি গ্রাম প্লাবিত হয়। এ বছরও মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকা এবং বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে ধারাবাহিক ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম. ইব্রাহিম খলিল মামুন বললেন, ‘২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বন উজাড়, পাহাড় কেটে আশ্রয়শিবির নির্মাণ এবং মানুষের চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি কক্সবাজার শহরে পাহাড় কেটে আবাসন নির্মাণ, খাল-নালা ভরাট, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ ও নগর সম্প্রসারণ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।’
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ডিজাস্টার রেসপন্স বিভাগের পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের মতে, পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়েছে। পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়েছে। শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অতিবৃষ্টির চাপ সামাল দিতে পারছে না। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরও এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলছিলেন, ‘বর্তমান সংকট শুধু অতিবৃষ্টির ফল নয়। কক্সবাজারে জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে।’
আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বললেন, ভবিষ্যতে মোট বর্ষণের পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে অতি ভারী বৃষ্টিপাত আরও বাড়বে। উপকূলীয় ও পাহাড়ি জেলা হিসেবে কক্সবাজারের জন্য এটি বড় সতর্কবার্তা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষায়, এবারের দুর্যোগ প্রমাণ করেছে কক্সবাজারে বর্ষা এখন আর শুধু প্রাকৃতিক ঋতু নয়; মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড এটিকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়ংকর করে তুলেছে।
তার মতে, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতির পরিকল্পিত পুনর্বাসন, খাল-নালা পুনরুদ্ধার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আগাম সতর্কবার্তার ভিত্তিতে দ্রুত মানুষ সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো না হলে কক্সবাজারে বর্ষা এলেই প্রতিবছর মানবিক বিপর্যয় হবে। আর বৃষ্টি নামলেই পাহাড় ভাঙবে, ঘর চাপা পড়বে, বাড়বে প্রাণহানির মিছিল।






