অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে প্রহরী জরিনা

পতাকা নেড়ে ট্রেনচালককে লাইন উন্মুক্ত থাকার সংকেত দেন জরিনা বেগম। ছবি: আগামীর সময়
হাতে একটি লাঠি, তাতে জড়ানো এক টুকরো সবুজ কাপড়। এই লাঠি উঁচু করেই ছুটে আসা ট্রেনের চালককে লাইন উন্মুক্ত থাকার সংকেত দিচ্ছেন এক নারী। রেললাইনের একপাশে বাঁশ দিয়ে আটকানো, অন্যপাশে দাঁড়িয়ে তিনি দুই হাত নেড়ে চিৎকার করে পথচারীদের সতর্ক করে বলছেন, ‘ট্রেন আসছে, আপনারা একটু দাঁড়ান!’ নওয়াপাড়া গার্লস স্কুল রোডের অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে এটি অতি পরিচিত দৃশ্য। মানুষের জীবন বাঁচাতে বিনা পারিশ্রমিকে দিনের পর দিন এ কাজ করে যাওয়া নারীর নাম জরিনা বেগম (৬০)।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, খুলনা-যশোর রুটে নওয়াপাড়া থেকে যশোর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে ৪৫টি ক্রসিং রয়েছে, যার মধ্যে ৩৬টিতেই কোনো গেটম্যান নেই। এর মধ্যে অরক্ষিত নওয়াপাড়া গার্লস স্কুল রোড, আকিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ রোড ও বালিয়াডাঙ্গা রেলক্রসিং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতীতে নওয়াপাড়া গার্লস স্কুল রোড, আকিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ রোড ক্রসিংয়ে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নওয়াপাড়া গার্লস স্কুল রোড ক্রসিংটি রেলওয়ের তালিকাভুক্ত না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এখানে কোনো গেটম্যান নিয়োগ দেয়নি। তবে নওয়াপাড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ এখানে অস্থায়ী ভিত্তিতে গেটম্যান নিয়োগ দিয়ে আসছে ২০১৬ সাল থেকে। জরিনা বেগমের ছেলে মাসুদ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পৌরসভার ৪ হাজার ৪১০ টাকা বেতনে এখানে গেটম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে মাসুদ কাজ ছেড়ে দেওয়ায় গত ১ এপ্রিল থেকে বিনা বেতনে এই গেটের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন মাসুদের মা জরিনা বেগম।
প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত টানা ১৭ ঘণ্টা এই ক্রসিংটি একাই সামলান তিনি। প্রচণ্ড রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি, কালবৈশাখী কিংবা কনকনে শীত— প্রকৃতির কোনো বৈরিতাই তাকে দমাতে পারে না।
জরিনা বেগমের স্বামী আলাউদ্দিন তিন বছর আগে মারা গেছেন। চার ছেলে থাকলেও তারা সবাই অন্যত্র বসবাস করেন।
নওয়াপাড়া রেলস্টেশনের পাশে রেলবস্তিতে বসবাসকারী জরিনা বেগম বলছিলেন, ‘ট্রেন আসার ১০ মিনিট আগে রেলস্টেশনের অদূরে সিগন্যাল পোস্টে সিগন্যাল দেখে গেটে আসি। মানুষকে চলাচল না করার জন্য অনুরোধ করি। বছরে একটি দিনও ছুটি পাই না, ঈদের দিনেও ডিউটি করতে হয়। এখানে আমার বসার মতো কোনো ভালো জায়গা নেই, রোদ-বৃষ্টিতে খুব কষ্ট হয়।’
‘অমি কয়েক মাস যাবৎ বিনা বেতনে এখানে কাজ করছি। আমাকে বেতন না দিলেও আমি জনগণের সেবায় কাজ করে যাব। আশা করি, পৌরসভা আমার বিষয়টি নিয়ে ভাববে’— যোগ করেন জরিনা।
নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন বিশ্বাস জানালেন, জরিনা বেগম অন্যের জীবনের নিরাপত্তা দিলেও তার নিজের বসার ঘর বা নিরাপত্তায় নেই কোনো ব্যবস্থা।
রেলক্রসিং নিয়ে কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকলেও জরিনা বেগম যেন দায়িত্ববোধ আর মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একটি বাঁশ আর এক টুকরো সবুজ কাপড় নিয়ে সক্রিয় থেকে তিনি প্রতিদিন আগলে রাখছেন অনেক মানুষের জানমাল।
নওয়াপাড়া রেলস্টেশন মাস্টার ইয়াসির আরাফাত জানিয়েছেন, গার্লস স্কুল সড়কের গেটম্যানসহ সার্বিক সমস্যার কথা জানানো হবে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে।
নওয়াপাড়া পৌর প্রশাসক ও অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ সালাউদ্দিন দিপু জানিয়েছেন, মাসুদ নামে একজন ওই রেলগেটে কাজ করতেন। তিনি এখন দায়িত্ব পালন না করায় তার মা জরিনা বেগম সেই দায়িত্ব পালন করছেন। দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেরি হওয়ায় তাকে এখন বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরে তাকে মাস্টাররোলের মাধ্যমে বেতনের আওতায় আনা হবে।




