প্রাথমিকে থামছেই না কেলেঙ্কারি
পরীক্ষা ছাড়াই ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, এবার প্রকাশের আগেই ফল ফাঁস
- ২০২৩-এর ‘ভূত’ ২০২৫-এও
- ডিপিই-এর আইটি টিমের চরম অবহেলা
- তদন্তে ৩ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি

বারবারই বিতর্কের মুখে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)
প্রাথমিক স্তরে মেধাবীদের মূল্যায়ণে বৃত্তি দিতে গিয়ে বারবারই বিতর্কের মুখে পড়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। ২০২৩ সালে পরীক্ষা না দিয়েও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় কয়েকজন শিক্ষার্থী। শুধু তাই নয়, একই রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থী দুটি ভিন্ন জেলা থেকে বৃত্তি পাওয়া ঘটনা ঘটে। ফল ঘোষণা করে চার ঘণ্টার মধ্যে সেই ফল স্থগিত করা হয়। নজিরবিহীন সেই কেলেঙ্কারির দাগ কাটতে না কাটতেই এবার ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই অনলাইনে ফাঁস হয়ে যায় বৃত্তির ফল। ফল প্রকাশের ঘোষণা দিয়েও বৃহস্পতিবার বৃত্তির ফল প্রকাশ করতে পারেনি গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ডিপিই সংশ্লিষ্টরা জানালেন, গত ৮ জুলাই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রস্তুত করা হয়। ফল প্রকাশের সুবিধার্থে ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় লিংক তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অধিদপ্তরের সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার মেহতাব কায়েসকে। কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পূর্বে কোনোভাবেই যেন এই ফলাফল লাইভ সার্ভারে আপলোড করা না হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিভাগের ৯টি জেলার ফলাফল ওই লিংকগুলোতে আপলোড করে দেওয়া হয়। লিংক সচল হতেই মুহূর্তের মধ্যে তা সাধারণ ব্যবহারকারী ও অভিভাবকদের নাগালে চলে যায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুঁ হুঁ করে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ফলাফল প্রকাশের গোপনীয়তা ও তথ্য প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। ডিপিই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইএমটি) বিভাগের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লাইভ সার্ভারে ডেটা আপলোডের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি নিরাপত্তা প্রটোকল একেবারেই মেনে চলা হয়নি। এর পরপরই টনক নড়ে সরকারে কর্তাব্যক্তিদের। পুরো ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অধিদপ্তর ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।
কী ঘটেছিল ২০২৩ সালের ফলে
বৃত্তি পরীক্ষার ফল নিয়ে ডিপিই-এর এমন বড় বিপর্যয় এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ২০২২ সালের বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ নিয়ে দেশজুড়ে হুলুস্থুল পড়ে যায়। সে সময় সফটওয়্যার কোডিংয়ের মারাত্মক ত্রুটির কারণে পরীক্ষা না দিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। আবার একই রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থী ঝিনাইদহ ও সুনামগঞ্জের জেলা থেকে পাস করার মতো অবাস্তব ঘটনাও ঘটেছিল।
তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৃত্তি পরীক্ষার ফল ঘোষণা করেন। ফলাফল প্রকাশের পরপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য সব ত্রুটির খবর আসতে থাকে। সমালোচনার মুখে ফল প্রকাশের মাত্র ৪ ঘণ্টার মাথায় তা স্থগিত করতে বাধ্য হয় সরকার। দুই বছর পর আবারও আইটি বিভাগের একই ধরনের চরম অবহেলা ও সমন্বয়হীনতা পুরো বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করল।
ওই সময় সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটে পরীক্ষা না দিয়েও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া ঘটনা। অনেক শিক্ষার্থী যারা মূল পরীক্ষায় অংশই নেয়নি বা অনুপস্থিত ছিল, তাদের রোল নম্বরও মেধা তালিকায় চলে আসে। মেধা তালিকায় ঝিনাইদহ ও সুনামগঞ্জের মতো ভিন্ন দুটি জেলার ভিন্ন দুই শিক্ষার্থীর কোড নম্বর এক হয়ে যাওয়ায় একই রোল নম্বরধারী শিক্ষার্থী দুটি ভিন্ন জেলা থেকে বৃত্তি পেয়ে যায়। অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অভিযোগ করেন, তাদের স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ও পরীক্ষায় নিশ্চিত ভালো করা শিক্ষার্থীরা তালিকায় স্থান পায়নি, অথচ তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া কিংবা অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরা বৃত্তি পেয়ে যায়।
কীভাবে ঘটে এই বিপর্যয়
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানালেন, এটি মূলত কোনো ম্যানুয়াল জালিয়াতি বা জেনেশুনে করা অপরাধ ছিল না, বরং ছিল অধিদপ্তরের আইটি টিমের চরম অবহেলা। বিগত তিন বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা না হওয়ায়, আগের ডেটাবেজের কোড বিন্যাস ব্যবহার করে নতুন সফটওয়্যারে কেন্দ্রীয়ভাবে এই ফলাফল প্রসেস করা হয়েছিল। উপজেলাভিত্তিক কোড নম্বরগুলো যখন কেন্দ্রীয় সফটওয়্যারে ইনপুট দেওয়া হয় তখন একই কোড একাধিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে মিলে যায় (ডুপ্লিকেট কোড)। সফটওয়্যারের এই বাগ বা ত্রুটিটি চূড়ান্তভাবে আপলোড করার আগে ক্রস-চেক করার ন্যূনতম দায়িত্বও পালন করেনি সংশ্লিষ্ট কমিটি।
ফলাফল প্রকাশের পর যারা আনন্দে মিষ্টি বিতরণ করেছিল, বিকেল গড়াতেই ফলাফল স্থগিতের খবরে তাদের ঘরে নেমে আসে অন্ধকার। কোমলমতি শিশুদের মানসিক অবস্থা নিয়ে এমন ছেলেখেলা করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিভাবকেরা তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন।
দেশজুড়ে হুলুস্থুল পড়ে যাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যে ফলাফল সাময়িক স্থগিত করেন। পরবর্তীতে ঘটনার তদন্তে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয় এবং দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার পুনর্মূল্যায়ন শেষে সংশোধিত ও নির্ভুল ফলাফল পুনরায় প্রকাশ করতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিক স্তরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে ১৯৭৩ সালে প্রথম প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়। দীর্ঘ চার দশক ধরে চলে আসা এই পরীক্ষাটি ২০০৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালুর পর বন্ধ হয়ে যায় এবং পিইসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃত্তি দেওয়া শুরু হয়। তবে কোভিড-১৯ মহামারি এবং নতুন শিক্ষাক্রমের কারণে পিইসি পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০২২ সালে আবারও পরীক্ষামূলকভাবে আলাদাভাবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল। সেই বছরে ফলাফলে চরম বিতর্কের জন্ম দেয়।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই অনলাইনে চলে আসার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে জানিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী আগামীর সময়কে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তথ্য প্রযুক্তির ঘাটতি ও অবহেলার বিষয়টি সামনে এসেছে। কীভাবে এটি ঘটেছে, কার দায়িত্বে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না— এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এরপর আমরা পরবর্তীতে করণীয় ঠিক করবো। ২০২৩ সালে ঘটনা সঙ্গে এটি তুলনা করতে নারাজ ডিজি। তিনি বলেন, ওই বছরে ঘটনাটি ছিল ভিন্ন ঘটনা যা এবারে সঙ্গে মিল নেই।




