পাহাড়চাপা এই জীবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি সভ্য ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রে প্রতি বছর একই কারণে মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পাহাড় ও টিলাধসে প্রাণহানি যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার দুর্বলতার প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হবে। এ বিষয়ে কিছু বলা ও করার অবকাশ রয়েছে।
পাহাড় ও টিলাপ্রধান এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ও টিলাধসে মৃত্যু ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যেন নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার এ বিষয়ে সতর্ক করার পরও অসচেতনতার কারণে এমন প্রাণ ও সম্পদহানির ঘটনা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। গত বুধবারও কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচ শিশু শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, একই দিনে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়। নগরের ষোলশহর মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় ও সীতাকুণ্ড থানাধীন জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় মারা যায় ওই দুই শিশু। এর আগে গত সোম ও মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর জানা যায়। এ মৃত্যু দায়হীন নয়। এর দায় কাউকে না কাউকে নিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা এ দুর্ঘটনা আকস্মিক নয়। প্রায় প্রতি বছরই পাহাড় ও টিলা অধ্যুষিত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কিছু অতিলোভী ও অপরিণামদর্শী মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের ফলে ঝরছে প্রাণ; বিনষ্ট হচ্ছে সম্পদ।
বাংলাদেশে বর্ষা মানেই একদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় ও টিলাধসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা। প্রতি বছর বর্ষা এলেই দেশের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ধসে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বৃহত্তর সিলেট জেলায় টিলাপ্রধান এলাকায়ও অনুরূপ ঘটনা ঘটে।
অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি স্থাপন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভারী বর্ষণে মাটি আলগা হয়ে পাহাড় ধসে পড়ে আর মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় অনেক পরিবার। প্রায় প্রতি বছরই বিশেষজ্ঞরা আগাম সতর্কবার্তা দিলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। ঝড়-বৃষ্টি-জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে আমরা জানি। সেখানে আগাম বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্ব স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের। কিন্তু কক্সবাজারের আবহাওয়া অফিসটি কার্যত অকেজো। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘আগামীর সময়’-এ প্রকাশিত ‘অকেজো আবহাওয়া অফিস’ শিরোনামে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি এই অফিসের রাডারটি তিন বছর ধরে অচল। ঢাকার তথ্যে চলছে অফিস। ফলে স্বাভাবিক কারণেই বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড় মৌসুমে সঠিক সময়ে আভাস জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না। এতে আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
অাবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তার যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল মৌসুমি উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন বছরব্যাপী সমন্বিত পরিকল্পনা। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি দ্রুত স্থানান্তর, পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ, বন সংরক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি।




