সংস্কৃতিচর্চার প্রয়োজন ও সংকট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পৃথিবীর সব দেশেই শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকূল্য থাকে। এটি শিল্প-সাহিত্যিকদের অধিকার। এই অধিকার উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই স্বীকৃত। যেহেতু শিল্প অন্যান্য ব্যবসার মতো লাভজনক নয়, তাই পৃথিবীর সব দেশেই শিল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। আমাদের দেশে উচ্চাঙ্গসংগীত ও যন্ত্রসংগীতের ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের শূন্যতা দেখা যাচ্ছে। বেহালা-বাঁশির মতো অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলো বাজানোর শিল্পীর সংখ্যা একেবারেই কমে যাচ্ছে। একসময় গ্রামে-গঞ্জেও চমৎকার বাঁশিবাদক, ট্রাম্পেড বাজানোর লোক ছিল; ঢোল তো পাওয়াই যেত। এখন তালযন্ত্রের জায়গা দখল করছে কম্পিউটারচালিত যন্ত্র।
উচ্চাঙ্গসংগীতের একটা রেওয়াজ মফস্বল শহর থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যারা গান শিখতে চাইত, তাদের শুরুই হতো উচ্চাঙ্গসংগীত দিয়ে, যাতে সঠিক সরগমটি কানে লেগে যায়। সেসবও এখন অনুপস্থিত। দেশে কয়টা এস্রাজ পাওয়া যাবে?
সেতার ক্রমে দুর্লভ হয়ে উঠছে। এসব যন্ত্র যে শিল্পীরা বাজান, তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য দিয়েই বাঁচিয়ে রাখতে হয় এবং চর্চার ব্যবস্থা করতে হয়। এসব কারণেই শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু শিল্পকলায় নিজস্ব শিল্পী থাকায় বাইরের শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা কমে এসেছে। বহুবার বলার চেষ্টা করেছি, শিল্পকলা একাডেমি যাতে শুধু নিজেদের শিল্পী দিয়ে অনুষ্ঠান না করে; বিভিন্ন সংগঠনে কর্মরত শিল্পীদের নিয়েও যেন অনুষ্ঠান করে।
স্বাধীনতার পরে বলা হয় সবচেয়ে উজ্জ্বল ফসল ফলেছে নাট্যকলায়। একবারেই পৃষ্ঠপোষকতাহীন এই বিশাল শিল্পটি নিজেদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল। সরকার একটা দায়সারা অনুদান দিয়েই তার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু বলা হয়েছিল, যেসব দল নিয়মিত নাট্যচর্চা করে থাকে, তাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রকল্পভিত্তিক অনুদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এসবের তদারকির জন্য যথাযথ বিশেষজ্ঞরা থাকবেন এবং শিল্পকলা একাডেমি সেই বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী নাট্যদলটির মূল্যায়ন করবে। শুধু তাই নয়, জাতীয় নাট্যশালা বছরে একটি-দুটি করে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে রেপার্টরি ব্যবস্থা চালু করবে, যা জাতীয় ক্ষেত্রে এবং বিদেশে প্রতিনিধিত্ব করবে। এর মধ্য দিয়ে বেশ কিছু শিল্পীর জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। কিন্তু গত ৫৫ বছরে সরকারের দেওয়া নামমাত্র অনুদান দিয়ে একটি যোগ্য দলের পক্ষে এক মাসের ব্যয় নির্বাহ করাও সম্ভব হয় না। অথচ একেবারে নামমাত্র সংগঠনও এই অনুদান পেয়ে থাকে। নানা ধরনের স্বজনপ্রীতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ— এসবই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করে।
পৃথিবীর অনেক দেশেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নেই। এটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়টি দৃশ্যমান নয় এবং নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বিবেচনার মধ্যে আসে না
এদিক দিয়ে চলচ্চিত্রের অনুদান প্রক্রিয়া তুলনামূলক ভালো। যারা অনুদান প্রত্যাশা করে, তাদের প্রথমে চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি, কলাকুশলীদের নাম ও কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। তারা যাচাই করে। তারপর অনুদান কমিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। যাদের অনুদান দেওয়া হয়, পরে তাদের কয়েকটি ধাপে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করতে হয়। ব্যবস্থাটি যথার্থই কার্যক্ষম।
কিন্তু চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি বাছাই এবং পরবর্তী কার্যক্রমে সঠিক ব্যক্তিরা না থাকায় একটা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সেখানেও বিরাজমান। ক্ষমতাসীন সরকারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিও এ ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু কমিটিগুলো যদি সত্যিকারের দক্ষ এবং পেশাদারি লোকদের দ্বারা গঠিত হয়, তাহলে সমস্যা অনেকটা কমে যায়। অনেক সময় দেখা যায়, অনুদান পাওয়ার পরও বছরের পর বছর চলচ্চিত্রটি নির্মাণের কাজ শেষ করে না। যেহেতু এই অনুদানের অর্থ জনগণের রাজস্ব থেকে আসে, তাই নির্বাচিত সরকারের বড় ধরনের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতার জায়গাটি হচ্ছে— একটি নিরপেক্ষ অনুদান কমিটি গঠন করা। এটি সংস্কৃতি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদেরই কাজ। সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান নিয়ে অনেক ধরনের প্রশ্ন এসেছে। প্রশ্নটি গুরুতর হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে কর্মরত নাট্যদলগুলো সম্পর্কে মন্ত্রণালয় অবহিত নয়। তাদের কমিটির ওপরেই নির্ভর করতে হয়েছে। এই কমিটির একজন প্রভাবশালী সদস্য বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের ক্ষমতার রাজনীতিতে নানাভাবে যুক্ত। একটি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির তিনি নির্বাহী। তদন্ত করলেই মন্ত্রণালয় দেখতে পাবে, কীভাবে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। যেসব দল সঠিকভাবে অনুদানটি পেয়েছে, তাদের বিষয়ে কিছু বলার নেই। অনুদান থেকে পাওয়া অর্থ তারা নাটকের কাজেই ব্যবহার করবেন। কিন্তু যাদের বিগত বছরগুলোতে কোনো নাটকের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ততা নেই, তাদের অর্থ প্রদান পক্ষান্তরে ফেডারেশনের রাজনৈতিক অভিলাষকেই পূর্ণ করবে। বর্তমানে দেশে মূলধারার সংস্কৃতি একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে একধরনের ন্যারেটিভ তৈরির প্রচেষ্টায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে গেছে। সে সময় শিল্প-সাহিত্য নানাভাবে সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে, মৌলবাদী ধারার সংগঠনগুলোর অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সুফি দর্শনের প্রেরণায় যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, তা এক সংঘাতের সম্মুখীন হয় তখন। মাজারগুলো আক্রান্ত হয় ব্যাপকভাবে। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বহমান চারণ কবি ও বাউলরাও আক্রান্ত হয়। যুগ যুগ ধরে এই বাউলরাই সাধারণ মানুষের মধ্যে শান্তির বাণী শুনিয়ে আসছিল এবং একটি যথার্থই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ এবং চর্চার ব্যবস্থা এখন বড় বেশি অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সত্যি কথা বলতে গেলে ঢাকার বাইরের শহর ও গ্রামে সংস্কৃতি চর্চা একেবারে সংকুচিত। এবং এই সংকোচন দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ক্ষমতার রাজনীতি দেশের অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, মানুষের জীবন-জীবিকার তদারকি করে থাকে বটে; কিন্তু মানবিক উন্নয়নের জন্য যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ, সেই সংস্কৃতি চর্চা অবহেলিত রয়ে গেছে।
একসময় আমি বলেছিলাম, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থাকার প্রয়োজন নেই। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অংশ হিসেবে অনেক বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নেই। এটিকে শিক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংস্কৃতি বিষয়টি দৃশ্যমান নয় এবং নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও বিবেচনার মধ্যে আসে না। সংস্কৃতির প্রবাহকে স্বচ্ছ ও বাধাহীনভাবেই চলতে দেওয়া উচিত। এটি একটি প্রধানতম সামাজিক বিষয়। সমাজের গভীরে এই চর্চাকে উৎসাহিত করতে না পারলে সমাজ অস্থির হয়ে উঠবে। সে অস্থিরতার নানা প্রমাণ আমরা এরই মধ্যে পেতে শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে শুধু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নয়; শিক্ষা ও তথ্য মন্ত্রণালয়কেও হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা আছে। সমাজে সহনশীলতা শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সচেতন মানুষ তৈরির কাজে তাকে ভূমিকা পালন করতে হবে। অবশ্য এরই মধ্যে সরকার ক্রীড়া, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাটকের বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করি। তবে এসবের প্রায়োগিক দিকও বিবেচনা করা দরকার। শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য এসবই হচ্ছে জ্ঞানচর্চার মাধ্যম। বেশ অনেক দিন ধরেই আমাদের মধ্যে জ্ঞানচর্চার অভাব দেখা দিয়েছে। জ্ঞানের বাজারদর কমে গিয়ে সার্টিফিকেট পাওয়াই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জ্ঞান যাতে মানুষের কাজে লাগে, তার জন্য যে প্রতিনিয়ত চর্চা করতে হয়, সেই চর্চার নামই সংস্কৃতি চর্চা। আর সংস্কৃতি চর্চার ফলেই মানুষের রুচির পরিবর্তন হয় এবং সমাজে রুচির দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সে সমাজকে মানবিক করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব





