মাদক থেকে বাঁচতে ইসলামের নির্দেশনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একজন মানুষকে নীরবে ধ্বংস করার পাশাপাশি একটি পরিবারকেও ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। দুর্বল করে দেয় সামাজিক কাঠামো। তাই ইসলাম মাদককে ব্যক্তিগত পাপ হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারণের শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ ‘শয়তান মদ ও জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৯০, ৯১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই মাদক এবং প্রত্যেক মাদকই হারাম।’ (মুসলিম, হাদিস: ২০০৩) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে জিনিস অধিক নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৮১)
ইসলাম কেন মাদকের ব্যাপারে এত কঠোর হওয়ার কারণ, মাদক মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিবেক ও বিচারশক্তি কেড়ে নেয়। মাকাসিদুশ শরিয়াহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো মানুষের হিফযুল আকল বা বুদ্ধি সংরক্ষণ। ইমাম শাতিবি (রহ.) তার আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে ব্যাখ্যা করেছেন, শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদের সংরক্ষণ। মাদক এই পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যের প্রতিটিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তার চিন্তাশক্তি দুর্বল হয়ে যায়, দায়িত্ববোধ কমে যায় এবং নৈতিক বোধ ক্ষয় হতে শুরু করে। ফলে সে নিজের জীবন, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। এ কারণেই ইসলাম নেশার সূচনাকেই বন্ধ করতে চেয়ে শুধু পান করা নয়; বরং সেই পথে নিয়ে যায়— এমন সব কারণ থেকেও দূরে থাকতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
যারা এরই মধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছেন তাদেরও ইসলাম হতাশার বার্তা না শুনিয়ে ‘তাওবার দরজা কখনো বন্ধ নয়’ বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে
মাদকের দ্বিতীয় বড় শিকার হয় পরিবার। একটি পরিবারের সুখ গড়ে ওঠে অর্থ, বিশ্বাস, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। কিন্তু মাদক এর সবকটিই নষ্ট করে দেয়। সংসারের উপার্জন বিনষ্ট হয়, দাম্পত্য সম্পর্কে অবিশ্বাস জন্ম নেয়, সন্তানরা বেড়ে ওঠে মানসিক অনিরাপত্তায়।
মাদকের তৃতীয় শিকার হয় সমাজ। মাদক সেবন শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তির মধ্যে যুক্ত হয় অসততা, দায়িত্বহীনতা, সহিংসতা এবং নানা ধরনের অপরাধের ঝুঁকি। বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়ার কারণে ব্যক্তি নিজের ও অন্যের ক্ষতির কারণ হতে শুরু করে। তাই ইসলাম ব্যক্তিগত চরিত্র গঠনের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআন মানুষের কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করার নির্দেশ দিয়েছে। (সুরা মায়িদা, আয়াত : ২) মাদকবিরোধী সামাজিক অবস্থান এই কোরআনিক নীতিরই বাস্তব প্রয়োগ।
তবে ইসলামের সৌন্দর্য হলো, এটি শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়েই নীরব থাকেনি; বরং প্রতিরোধের পথও দেখিয়ে দিয়েছে। মাদকের থাবা থেকে দূরে থাকার প্রথম প্রতিরোধ হলো ঈমান ও তাকওয়া। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করেন প্রতিটি কাজের হিসাব একদিন আল্লাহর কাছে দিতে হবে, তিনি নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে বেশি সক্ষম হন।
মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে থাকার দ্বিতীয় প্রতিরোধ হলো সৎ সঙ্গ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সৎ ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো কস্তুরীওয়ালা ও কামারের হাপরের মতো। কস্তুরীওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪) এই হাদিস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, অনেক সময় একটি ভুল বন্ধুত্বই মাদকের প্রথম দরজা খুলে দেয়।
মাদক থেকে বাঁচার তৃতীয় প্রতিরোধ হলো শক্তিশালী পরিবার কাঠামো। সন্তানকে শুধু ভরণপোষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার মানসিক অবস্থা, বন্ধুমহল এবং নৈতিক বিকাশের দিকেও মা-বাবাকে নজর দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)
মাদকমুক্ত জীবন গড়ার চতুর্থ প্রতিরোধ হলো সমাজের দায়িত্ববোধ। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, গণমাধ্যম এবং স্থানীয় নেতৃত্ব যদি তরুণদের জন্য সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলে, তবে মাদকের বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। ইসলাম ন্যায় ও কল্যাণের কাজে সহযোগিতার যে শিক্ষা দিয়েছে, তা মাদক প্রতিরোধেও প্রযোজ্য।
যারা এরই মধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছেন, তাদেরও ইসলাম হতাশার বার্তা না শুনিয়ে ‘তাওবার দরজা কখনো বন্ধ নয়’ বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা যুমার, আয়াত : ৫৩) তাই আসক্ত মানুষকে ঘৃণা করে দূরে ঠেলে না দিয়ে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, পারিবারিক সমর্থন এবং তাওবার সুযোগ করে দেওয়াই ইসলামি মানবিকতার অংশ।
মাদকবিরোধী সংগ্রাম কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ, একটি সুস্থ সমাজ তখনই গড়ে ওঠে, যখন মানুষের বিবেক জাগ্রত ও পরিবার দৃঢ় থাকে এবং মূল্যবোধ জীবন্ত থাকে।
তাই মাদকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে শুধু মাদকবিরোধী অভিযান নয়, প্রয়োজন মাদকবিরোধী চেতনা বৃদ্ধি করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




