দুষ্প্রাপ্য বইয়ের রত্নভাণ্ডার তকমা হারাচ্ছে নীলক্ষেত

ছবি: আগামীর সময়
ভোক্তার চাহিদা অনুসরণ করেই গড়ে ওঠে বাজার। সব ক্ষেত্রেই এ নিয়ম কতটা খাটে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বাজারবিশ্লেষকরা ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন। তবে সাধারণ ধারণা হলো, চাহিদাই বাজার তৈরি করে। আর একটি বাজার দীর্ঘদিন ধরে কোনো বিশেষ পণ্যের জন্য পরিচিতি পেলে সেটিই একসময় তার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। রাজধানীর নীলক্ষেতও তেমনই একটি নাম। দীর্ঘদিন ধরে এটি ছিল দুষ্প্রাপ্য ও সৃজনশীল বইয়ের অন্যতম বড় বাজার। এখানে একটি দুর্লভ বই খুঁজে পাওয়া যেন গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়ার মতোই রোমাঞ্চকর ছিল। সরু গলি, বইয়ের স্তূপ আর পুরনো কাগজের গন্ধ— সব মিলিয়ে নীলক্ষেত ছিল বইপ্রেমীদের অলিখিত তীর্থস্থান। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই নীলক্ষেত কি তার পরিচয় বদলে ফেলছে? সৃজনশীল ও দুষ্প্রাপ্য বইয়ের খোঁজে এখন আর কি প্রথমেই নীলক্ষেতে ছুটে যান পাঠকরা? এ প্রজন্মের ক্রেতারাই বা কি বই খুঁজতে সেখানে যান?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফসান হাবিব বলছিলেন, ‘নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে চোখ রাখলেই বোঝা যাবে, দেশের তরুণ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ কোন পথে।’ তার মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজের মতো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নীলক্ষেত শুধু একটি বইয়ের বাজার নয়; এটি শিক্ষার্থীদের পাঠরুচি, চিন্তার পরিসর ও সময়ের সামাজিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রিফতি আল জাবেদ বললেন, ‘আগে বই হাতে নিয়ে পড়া হতো। এখন অনলাইনেই অনেক দুর্লভ বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায়। ফলে বই কিনে পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নীলক্ষেতে গিয়ে হাতেগোনা কয়েকবার বই কিনেছি। যে বই কিনব, তার প্রায় সবই যখন অনলাইনে পাওয়া যায়, তখন কেন নীলক্ষেতে গিয়ে কিনব?’
এক বিকালে নীলক্ষেত ঘুরে দেখা গেল, ফুটপাতে বই সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতা রাসেল। ইডেন মহিলা কলেজের দুই শিক্ষার্থী খুঁজছেন জিআরই প্রস্তুতির বই। পাশেই আরেকজনের হাতে চাকরির পরীক্ষার গাইডের তালিকা। দোকানের এক কোণে সাজানো আছে জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, জহির রায়হানের ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’সহ হুমায়ূন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই। কিন্তু একসময় যে নীলক্ষেত দুষ্প্রাপ্য সংস্করণ, বিলুপ্ত প্রকাশনার গ্রন্থ কিংবা বহুদিনের অপ্রাপ্য বইয়ের জন্য কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছিল, সেই সংগ্রহ এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। সাম্প্রতিক লেখকদের সাহিত্যও খুব একটা নেই। বরং ক্যারিয়ার, মোটিভেশন, ভর্তি পরীক্ষা ও চাকরির প্রস্তুতির বইয়ের সারির ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য যেন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।
রাসেল বললেন, ‘এখন সাহিত্যের বই কম বিক্রি হয়। চাকরির প্রস্তুতি, ভর্তি পরীক্ষা আর ইংরেজি শেখার বইয়ের চাহিদাই বেশি।’ নীলক্ষেতের আরও কয়েকজন বিক্রেতার বক্তব্যেও মিলল একই বাস্তবতা। তাদের ভাষায়, পাঠকের প্রয়োজন বদলেছে; তাই বদলে গেছে বইয়ের বাজারও। অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। নীলক্ষেত ও বাংলাবাজার ছিল পুরনো বইয়ের স্বর্গরাজ্য। ফুটপাতের চটের ওপর কিংবা ছোট্ট টংঘরে স্তূপ হয়ে থাকত দুর্লভ সব বই। ব্যক্তিগত সংগ্রহ, বিলুপ্ত প্রকাশনা, শতবর্ষী সংস্করণ কিংবা বিদেশি সাহিত্য— ধৈর্য নিয়ে খুঁজলে একসময় প্রায় সবই মিলত।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নীলক্ষেতে পুরনো বই বিক্রি করছেন মাহমুদ সুলতান। পরিবর্তনের এই দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী তিনি। তার ভাষায়, ‘এখনকার পোলাপান তো অনলাইনেই বই কিনে ফেলে। বই বিক্রি কমে গেছে। ক্যারিয়ারের বই আর গাইড বই বেশি চলে। সাহিত্যের বই তেমন বিক্রি না।’ নীলক্ষেতের বইয়ের বাজারে বড় ধাক্কা আসে কভিড-১৯ মহামারীর সময়। কিছু দোকান বন্ধ হয়ে গেলেও পরে নতুন অনেক দোকানও গড়ে ওঠে। তবে সৃজনশীল বইয়ের বাজার সংকুচিত হয়ে যায়। শুধু বই কেনার মাধ্যম নয়, বদলে গেছে বই পড়ার ধরনও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী রিফতি আল জাবেদ বললেন, ‘আগে বই হাতে নিয়ে পড়া হতো। এখন অনলাইনেই অনেক দুর্লভ বইয়ের পিডিএফ পাওয়া যায়। ফলে বই কিনে পড়ার আগ্রহ কমে গেছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নীলক্ষেতে গিয়ে হাতেগোনা কয়েকবার বই কিনেছি। যে বই কিনব, তার প্রায় সবই যখন অনলাইনে পাওয়া যায়, তখন কেন নীলক্ষেতে গিয়ে কিনব?’ প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে শুধু বাজারের রূপান্তর হিসেবে দেখছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহমান মৈশান। তার মতে, এটি সমাজের জ্ঞানচর্চার ধরন বদলে যাওয়ারও একটি লক্ষণ। তিনি বললেন, বই এখন একটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। পাঠের ধরন বদলে গেছে। তিনি মনে করেন, উচ্চশিক্ষায় এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে চাকরি নিশ্চিত করা। ফলে জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসরের বদলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ঝুঁকছে ক্যারিয়ারমুখী বইয়ের দিকে। আগে চাকরির বইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন কিংবা সমাজবিজ্ঞানও সমান গুরুত্ব পেত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিওভিত্তিক কনটেন্ট এবং দ্রুত তথ্য পাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘ মনোযোগের পাঠকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
শাহমান মৈশান বলেছেন, ‘বই পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষের যে বিশ্লেষণক্ষমতা, কল্পনাশক্তি ও সামগ্রিক বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটে, তা শুধু ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট দেখে সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে পারছে বলে মনে হয় না।’




