বিষাদ ভূমিতে বর্বর হামলা

হরমুজ প্রণালীর কাছে এক ইরানি বন্দরে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স
শোকের মেঘে ভাসছিল পারস্যের আকাশ। অলিগলি থেকে ভেসে আসছিল কান্নার আওয়াজ। মধ্যরাত-তবু ঘুম নেই ইরানের। ঘরে ঘরে ‘পুরনো স্মৃতি’র আলো জ্বেলে জেগে ছিল প্রায় প্রতিটি পরিবারই। ঠিক তখনই শুরু হয় হামলা। শোকার্ত জাতির ওপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল যুক্তরাষ্ট্র। বর্বরতার নতুন ইতিহাস রচিত হলো প্রাচীন সভ্যতার আঙিনায়। শোকের চাদরে মোড়ানো এই শান্ত পারস্যের বুকে আছড়ে পড়ল মার্কিন যুদ্ধবিমানের নির্মম বজ্রাঘাত। দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আর বোমাবর্ষণে কেঁপে উঠল ইরানের মাটি। মুহূর্তেই বারুদের গন্ধে ঢেকে গেল বিদায়ের করুণ সুর। পরপর দ্বিতীয় রাতের মতো মরণকামড় দিল যুক্তরাষ্ট্র। সর্বোচ্চ নেতার ‘চিরঘুম’র শহর মাশহাদের রেললাইনসহ ৯০টির বেশি স্থাপনায় হামলা চালায় ওয়াশিংটন। হাত গুটিয়ে থাকেনি ইরানও। ড্রোন-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের নজিরবিহীন হামলায় তছনছ করে দেয় মধ্যপ্রাচ্যের চার মিত্র দেশের মার্কিন ঘাঁটি— কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে।
বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি ও নৌঘাঁটি, কুয়েতের আলি আল সালেম ও আহমদ আল-জাবের বিমানঘাঁটি, জর্ডানের আল-আজরাকের মার্কিন কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল কেন্দ্র ও বিমানঘাঁটি, জর্ডানের আল আজরাক বিমানঘাঁটিতে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। জর্ডানের ঘাঁটিগুলোয় একযোগে ১০টি দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় আইআরজিসি।
টানা দ্বিতীয় রাতের হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি উপকূলীয় ও কৌশলগত বন্দরনগরীতে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ওয়াশিংটন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় রাতে বুশেহরের পারমাণবিক স্থাপণার কাছাকাছি এলাকা, হরমুজের নিকটবর্তী বন্দর আব্বাস ও সিরিকের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলা চাবাহার ও কোনারকে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। এতে চাবাহারের বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আহভাজ শহরেও বোমাবর্ষণ করে। উত্তর ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে সেতুতেও হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে তারা। উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পর এটি ছিল সবচেয়ে বড় পরিসরে হামলা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, এ তীব্র বোমাবর্ষণের উদ্দেশ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করে দেওয়া।
আগের রাতের মতো বুধবার রাতেও ইরান জুড়ে বিমান হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এর জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক অবস্থানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে তেহরান।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগপ্রধান হোসেন কেরমানপোর বলেছেন, যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা অবস্থায় ৭ ও ৮ জুলাই ইরানের পাঁচটি প্রদেশে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় ১৪ জন শহীদ এবং আহত হয়েছেন ৭৮ জন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেহরানের সঙ্গে যুক্ত রেলপথের দুটি সেতু। এ ছাড়া, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান-তেহরান রেল করিডরের রেলপথও। বুশেহরে পারমাণবিক স্থাপনার কাছেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনার সুযোগ তৈরিতে গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল। এরপর এই পাল্টাপাল্টি হামলা ছিল সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাত।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে ইরানি হামলার কারণে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ হয়ে গেছে বলে বুধবার আঙ্কারায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই এসব হামলা চালানো হয়। হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুথ সোশ্যালে ইরানে হামলার ভিডিও পোস্ট করেন এবং দেশটিকে আবারও হুমকি দেন।
এদিকে মার্কিন হামলার জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর বাহরাইনে অবস্থিত। ইরানের হামলার সতর্কতায় দেশটিতে অন্তত তিনবার সাইরেন বেজে ওঠে। পাশাপাশি কুয়েত ও কাতার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরানি বাহিনী। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জর্ডানও। এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।




