ছেলের ইমামতিতে শহীদ খামেনির জানাজা
মাশহাদে কোটি মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়

আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির শেষ বিদায় ও জানাজায় মানুষের ঢল। ছবি: সংগৃহীত
কোটি মানুষের অংশগ্রহণে ইরানের মাশহাদ নগরীতে ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনির শেষ বিদায় ও জানাজা অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে অনুষ্ঠিত জানাজার নামাজে ইমামতি করেন তার বড় ছেলে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি।
বাবার কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলের ইমামতিতে জানাজার এই দৃশ্য উপস্থিত কোটি মানুষের জন্য ছিল এক আবেগঘন মুহূর্ত। ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র রওজায় শহীদ নেতার শেষ বিদায়ের এই দৃশ্য ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
তেহরান, কোম, নাজাফ ও কারবালায় কয়েক দিনের ঐতিহাসিক বিদায় অনুষ্ঠান শেষে শহীদ নেতার মরদেহ বৃহস্পতিবার মাশহাদে পৌঁছে। ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো শোকাহত মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে মাশহাদের রাজপথে জড়ো হন।
শহীদ নেতার জানাজার মিছিলে ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ, বিচার বিভাগীয় প্রধান মোহসেনি-এজেয়ি, সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোখবের এবং আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ হাসান খোমেনিকে দেখা গেছে।
মাশহাদের রাজপথে জনসমুদ্র
ভোর থেকেই ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র হারামমুখী সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। মরদেহ বহনকারী গাড়ি ইমাম রেজা সড়কে প্রবেশ করার পর তা চারদিক থেকে জনসমুদ্রে ঘিরে যায়। কুর্দ, তুর্ক, ফারসি, আরব ও লোরসহ ইরানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।
অশ্রুসিক্ত চোখ, প্রার্থনা এবং শোকের স্লোগানে পুরো মাশহাদ এক আবেগঘন পরিবেশে পরিণত হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি জাতীয় ঐক্যের অন্যতম বড় প্রকাশ।
শোকযাত্রায় ধ্বনিত হয়, ‘লাব্বাইক ইয়া হুসাইন’ (হে হুসাইন, আমরা উপস্থিত) স্লোগান। একই সঙ্গে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘ইসরাইল নিপাত যাক’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগানও শোনা যায়। শহীদদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা ও ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা বহন করেন অনেকে।
ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিশ্বের মানুষের অংশগ্রহণ
মাশহাদের এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেন ইরানের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে উপস্থিত হন সিস্তান ও বেলুচিস্তানের সুন্নি মুসলিমরা। স্থানীয় পোশাক পরে জাতীয় পতাকা বহন করেন চহরমহাল ও বখতিয়ারি প্রদেশের প্রতিনিধিরা।
শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মাশহাদে উপস্থিত হন আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মানুষও।
একজন কানাডিয়ান জানান, ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে এই ঐতিহাসিক বিদায়ে অংশ নিতে এসেছেন তিনি। ভারতের একজন বলেন, শহীদ নেতার শাহাদাতের খবর উপমহাদেশের মুসলমানদের হৃদয়ে সৃষ্টি করেছে গভীর শোক।
মাশহাদের শোক অনুষ্ঠানে অংশ নেন নাইজেরিয়ার ইসলামি আন্দোলনের নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকি। তুরস্ক ও নাইজেরিয়া থেকে আসা অনেক মানুষ স্লোগান দেন ‘লাব্বাইক ইয়া সাইয়্যেদ মোস্তফা’।
বিপুল জনসমাগমে পরিবর্তন করতে হয় শোকযাত্রার পথ
বিপুল মানুষের উপস্থিতির কারণে শোকযাত্রার যানবাহন নির্ধারিত পথে এগোতে পারেনি। দানেশ মোড় এলাকা থেকে শোকযাত্রার পথ পরিবর্তন করে ফেরদৌসি ফুটবল মাঠের দিকে নেওয়া হয়। পরে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পবিত্র দেহ মুবারক ইমাম রেজা (আ.)-এর হারামে পৌঁছানো হয়।
শোকযাত্রার সময় লাউডস্পিকারে শহীদ নেতার কণ্ঠ বাজানো হলে লাখো মানুষের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেকের হাতে ইংরেজিতে লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়— ‘উই স্ট্যান্ড আপ টু দ্য এন্ড’ (আমরা শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকব)। শোক মিছিলে ‘হেই ট্রাম্প, উই উইল কিল ইউ’ (ট্রাম্প, তোমাকে খুন করব আমরা) লেখা একটি বিশাল ব্যানারও দেখা গেছে।
ইমাম রেজা (আ.)-এর সান্নিধ্যে চিরনিদ্রায়
জানাজার নামাজে অংশ নেন শহীদ নেতার পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ। এত বড় জনসমাগম হয় যে শুধু হারামের ভেতর নয়, নওয়াব সাফাভি, তাবারসি ও শিরাজি সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে জানাজার কাতার।
আয়াতুল্লাহ খামেনি ছাড়াও শহীদদের মধ্যে ছিলেন তার ছেলে মোজতবা খামেনির স্ত্রী, খামেনির আরেক পুত্রবধূ এবং এক মেয়ে ও ১৪ মাস বয়সি নাতনি।
তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লা থেকে শুরু হওয়া বিদায় অনুষ্ঠান পরে কোম, নাজাফ ও কারবালায় অনুষ্ঠিত হয়। নাজাফ ও কারবালায় প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বলছেন আয়োজকরা।
শেষ পর্যন্ত ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র হারামের আজাদি প্রাঙ্গণের দারুয জিকর রওয়াকে শহীদ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের দাফন করা হয়। ভবিষ্যতে জিয়ারতকারীদের সহজ প্রবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন করা হয়েছে এই স্থান।
রাত নেমে এলেও হারাম ঘিরে অব্যাহত ছিল মানুষের সমাগম। দোয়া, শোকের পতাকা এবং ‘লাব্বাইক ইয়া হুসাইন’ ধ্বনিতে মাশহাদের আকাশ-বাতাস মুখর ছিল।
মাশহাদের এই ঐতিহাসিক বিদায় শুধু একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং ইরানের জনগণের ঐক্য, প্রতিরোধের আদর্শ এবং তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের এক বড় প্রকাশ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক : ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরবির সিনিয়র সাংবাদিক




